২১শে নভেম্বর, ২০১৮ ইং, বুধবার, ৭ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
  • প্রচ্ছদ » Uncategorized » একজন সম্পূর্ণ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের আদর্শ ও বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী বইটি নিয়ে কিছু কথা -লেখক – ইকবাল আহমেদ লিটন।



একজন সম্পূর্ণ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের আদর্শ ও বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী বইটি নিয়ে কিছু কথা -লেখক – ইকবাল আহমেদ লিটন।


প্রকাশিত :১৩.১০.২০১৮, ৭:৩৫ অপরাহ্ণ

একজন সম্পূর্ণ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের আদর্শ ও বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী বইটি নিয়ে কিছু কথা -লেখক – ইকবাল আহমেদ লিটন।
যাইহোক আজ আমি কারো রক্ত চাইতে আসিনি, আমি বঙ্গবন্ধুর কথা বলতে এসেছি; আমি তাঁর কথা বলতে এসেছি যিনি মাটিও মানুষের কথা বলতেন। ভালোবাসতেন, ফসল ভরা মাঠ, পাখির গান! যেমন উদারচেতা মানুষ ছিলেন তিনি।তেমনি কোন কমতি ছিলনা তাঁর চেহারার লাবন্যময়ীতায়! তিনি ছিলেন চির সত্যের মতো সুন্দর মাটির ও মনের মানুষ। বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু সকল শ্রেণির আপামর জনতা ভালোবাসেন তাঁর দূরদর্শীসাহসকে তিনিও মানুষের প্রতি ভালোবাসার কোনো ফারাক রাখেননি। একদিনতো তিনি হেঁটে যাচ্ছেন পাশ থেকে একজন বৃদ্ধা মহিলা মিনতি করে বললো, বাবা আমার বাড়ি আস একবার- আমি তোমার জন্য একবাটি দুধ ও কিছু টাকা রেখেছি! শুনে নির্বাক হয়ে গেলেন শেখ মুজিব টলমল চোখে চেয়ে থেকে আর্ত্যস্বরে জানালেন; মা’ দোয়া করবেন ছেলের জন্য………
তাঁর অমিত বিক্রম তর্জনির ইশারায় বাঁধভাঙ্গা উচ্ছ্বাসে ভরাট কণ্ঠে গুরুগম্ভীর ডাকে ঝাঁপিয়ে প’রে স্বাধীন হলো দেশ! মুক্তি পেলো জনতা গড়ে উঠে লাল-সবুজের সোনার বাংলা।
জনৈক এক বিদেশী সাংবাদিক জানতে চাইলেন, আচ্ছা আপনার শক্তি কি? উত্তরে বঙ্গবন্ধু বললেন, আমার সবচেয়ে বড় শক্তি আমি দেশের মানুষককে ভালোবাসি! সাংবাদিক প্রশ্ন করলেন, আপনার দূর্বলতা কোথায়? তিনি জানালেন, আমার সবচেয়ে বড় দূর্বলতা আমি তাঁদের খুব বেশি ভালোবাসি!
হে আকাশ বাতাস সাক্ষী থেকো বাংলার কোটি প্রাণ ভালোবাসে বঙ্গবন্ধুকে, ভালোবাসে জাতির জনককে- যার ভালোবাসা ছিলো হীমালয় সমান, আর তাই তিঁনি বলেছেন, তোমাদের কলম হোক শোষণ মুক্তির হাতিয়ার।” একটা মানুষ কত বড় মাপের হলে, মানুষকে কতটা ভালোবাসলে এমন গা ঝমঝম কথা বলতে পারে??
এ পৃথিবী দুই শিবিরে বিভক্ত, শোষিত আর শাষিত আমি শোষিতদের দলে” তাঁর এমন কথা গোটা পৃথিবীর কড়া নেড়ে দেয়; চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় পৃথিবীতে দুই শ্রেণির মানুষের বাস। তাই ফ্রিদেল ক্যাস্ট্রো সাধুবাদ জানিয়ে বলেছিলেন; আমি হীমালয় দেখিনি, দেখেছি বঙ্গবন্ধুকে যাঁর সাহস এবং আদর্শ হীমালয় সমান” বঙ্গবন্ধুর এমন তেজস্ক্রিয় আগ্নেয়ের মতো বাণীতে বিশ্বমঞ্চ থরথর করে কেঁপে উঠেছিলো, সাম্রাজ্যবাদীরা ভয়ে ছটপট করা শুরে করে দেয়।
সমবেত সকলের মতো আমিও গোলাপ ফুল খুব ভালোবাসি, রেসকোর্স পার হয়ে যেতেই সেইসব গোলাপের একটি গোলাপ গতকাল আমাকে বলেছে, আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি ।- নির্মলেন্দু গুন
এখন বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী সম্পর্কে আসা যাক;
২০০৪ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা চারটি খাতা আকস্মিকভাবে তাঁর কন্যা শেখ হাসিনার হস্তগত হয়। খাতাগুলি ছিল অতি পুরানো, পাতাগুলি জীর্ণপ্রায় এবং লেখা প্রায়শ অস্পষ্ট। সেই খাতায় শেখ মুজিব ১৯৬৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে অন্তরীণ অবস্থায় লেখা শুরু করেছিলেন। বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খানের সম্পাদনায় এই আত্মজীবনীমূলক লেখাকে গ্রন্থে রূপান্তরিত করা হয়। প্রকাশিত হয় বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের আত্মজীবনীগ্রন্থ – “অসমাপ্ত আত্মজীবনী”। ২০৯ নম্বর পৃষ্ঠা থেকে তুলে নিয়ে বইয়ের শুরুতেই যেকথা লেখা : ‘একদিন সকালে আমি ও রেণু বিছানায় বসে গল্প করছিলাম। হাচু ও কামাল নিচে খেলছিল। হাচু মাঝে মাঝে খেলা ফেলে আমার কাছে আসে আর ‘আব্বা’ ‘আব্বা’ বলে ডাকে। কামাল চেয়ে থাকে। এক সময় কামাল হাচিনাকে বলছে, “হাচু আপা, হাচু আপা, তোমার আব্বাকে আমি একটু আব্বা বলি।” আমি আর রেণু দু’জনই শুনলাম। আস্তে আস্তে বিছানা থেকে উঠে যেয়ে ওকে কোলে নিয়ে বললাম, “আমি তো তোমারও আব্বা।” কামাল আমার কাছে আসতে চাইত না। আজ গলা ধরে পড়ে রইল। বুঝতে পারলাম, এখন আর ও সহ্য করতে পারছে না। নিজের ছেলেও অনেক দিন না দেখলে ভুলে যায়! আমি যখন জেলে যাই তখন ওর বয়স মাত্র কয়েক মাস। রাজনৈতিক কারণে একজনকে বিনা বিচারে বন্দি করে রাখা আর তার আত্মীয়-স্বজন ছেলে-মেয়েদের কাছ থেকে দূরে রাখা যে কত বড় জঘন্য কাজ তা কে বুঝবে? মানুষ স্বার্থের জন্য অন্ধ হয়ে যায়।’
স্বাধীন বাংলাদেশ জন্ম নেওয়ার রাজপথের সফল কারিগর হিশেবে একজন শেখ মুজিব, নেতা হিশেবে একজন শেখ মুজিব, আন্দোলনে ফুঁসতে থাকা দিকনির্দেশনাহীন একটি জাতির আশাভরসার কেন্দ্রবিন্দু হিশেবে অবস্থান করা একজন শেখ মুজিব, প্রধানমন্ত্রী হিশেবে একজন শেখ মুজিব ইত্যাদি ইত্যাদি এক বিশাল বর্ণাঢ্য জীবনের পরতে পরতে লুকিয়ে থাকা সাদামাটা জগত সংসারের আবেগী একজন মানুষ হিশেবে শেখ মুজিব কেমন ছিলেন সেই ছবিটাই ভেসে উঠে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র এই কয়েক লাইনে। বইটির প্রচারণাতেও এই লাইনগুলো
আমাদেরকে তীব্র আকর্ষণ করে তুলে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের মতো একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতার আত্মজীবনী এদেশের ইতিহাসের একটি নথিপত্র বলা যায়। নিজেরমুখে স্বীকার করেছেন আমি তো লিখতে জানিনা, আমার জীবন আর এমন কি যে তা লিখে যেতে হবে এসব সরল স্বীকারোক্তির মধ্য দিয়ে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের বেপরোয়া ও একচেটিয়া শাসনব্যবস্থাকে পুরোপুরি টলিয়ে দিলেন যেই ব্যক্তি আমরা তাকে একজন সাধারণ দেশপ্রেমী আবেগী নাগরিক হিশেবে আবিষ্কার করি। বঙ্গবন্ধুর ভাষায় – সহকর্মীরা বলে, “রাজনৈতিক জীবনের ঘটনাগুলি লিখে রাখ, ভবিষ্যতে কাজে লাগবে।” আমার সহধর্মিণী একদিন জেলগেটে বসে বলল, “বসেই তো আছো, লেখ তোমার জীবনের কাহিনী।” বললাম, “লিখতে যে পারি না; আর এমন কি করেছি যা লেখা যায়! আমার জীবনের ঘটনাগুলি জেনে জনসাধারণের কি কোনো কাজে লাগবে? কিছুই তো করতে পারলাম না। শুধু এইটুকু বলতে পারি, নীতি ও আদর্শের জন্য সামান্য একটু ত্যাগ স্বীকার করতে চেষ্টা করেছি।”
পরিবার স্বজন ছেড়ে জেলে জেলে বন্দী জীবন কাটাচ্ছেন শেখ মুজিব, আর জেলখানায় অল্পসময়ের জন্য চোখের দেখা দেখতে এসেও জীবনসঙ্গিনী আত্মজীবনীর কথা জিজ্ঞেস করেছেন বারবার, তাগাদা দিয়েছেন লেখার জন্য। সহধর্মিণী বুঝে নিয়েছেন, এই পাহাড়সম জীবনে শুধু তাঁর একারই অধিকার নেই, লক্ষ জীবন_একটি গোটা জাতির ভবিষ্যৎ জড়িয়ে আছে যার জীবনের সাথে তার জীবনের গল্পগুচ্ছ সংরক্ষিত হওয়া প্রয়োজন। শেখ মুজিবও লিখেছেন গল্প বলার ঢঙে, সুখপাঠ্য হয়েছে পুরো আত্মজীবনীটি। বাংলাদেশ ও বাঙালির অনেক প্রশ্নের উত্তর মিলে যায় অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে। দেশ বিভাগের বহু প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন নিজের জীবনের গল্পে। শেখ মুজিব তাঁর জন্ম, শৈশব, বাল্য জীবন, পারিবারিক ঐতিহ্য, স্কুল ও কলেজের শিক্ষাজীবনের পাশাপাশি সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, দুর্ভিক্ষ, বিহার ও কলকাতার দাঙ্গা, দেশভাগ, তৎকালীন সামাজিক বন্ধন, মানুষের জীবন চরিত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের এক সাথে বসবাসের ইতিহাস, রাজনৈতিক দীক্ষাগুরু সোহরাওয়ার্দি সাহেবের সংস্পর্শে আসার ঘটনা বলেছেন স্পষ্ট ভাষায়। হাশিম সাহেবের রাজনৈতিক ক্লাসের ছাত্র, মওলানা আকরাম খাঁ, ভাসানী, নাজিমুদ্দীন প্রমূখ সম-সাময়িক রাজনৈতিক নেতাদের চারিত্রিক বিশ্লেষণের জন্যও বইটি গুরুত্বপূর্ণ। কর্মব্যস্ত একজীবনের সময় ও সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তিনি মুসলিম লীগের রাজনীতি, দেশ বিভাগের পরবর্তী সময় থেকে ১৯৫৪ সাল অবধি পূর্ব বাংলার রাজনীতি, কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক মুসলিম লীগ সরকারের অপশাসন, ভাষা আন্দোলন, ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা, যুক্তফ্রন্ট গঠন ও নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন, আদমজীর দাঙ্গা, পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের বৈষম্যমূলক শাসন ও প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের বিস্তৃত বিবরণ উল্লেখ করেছেন বইটিতে। এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম বলে পুরো জাতির স্বাধীনতা আন্দলোনে জলোচ্ছ্বাসের গতি এনে দেওয়া মানুষটির জীবনের না বলা কথাগুলোর পাশাপাশি আমাদের জাতীয় জীবনের গুরুতর অসংখ্য ঘটনার সরল মূল্যায়ন করেছেন তিনি বইটিতে। কারাজীবন, পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি ও সর্বোপরি সর্বংসহা সহধর্মিণী বেগম ফজিলাতুন্নেসার কথা বলে গেছেন অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে। এই বইয়ের আলোতেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ পরিবারের ভূমিকার গল্পে আমরা দেখি একজন বাঙালি নারী বেগম ফজিলাতুন্নেসাকে, যিনি নিজের সাংসারিক জীবনের অপূরণীয় আক্ষেপের কথা ভুলে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনে সহায়ক শক্তি হিসেবে সকল দুঃসময়ে অবিচল পাশে ছিলেন। অসমাপ্ত আত্মজীবনী বলে, মিটিং মিছিল শেষ করে পথেঘাটে বক্তৃতা দিতে দিতে রাত চারটার সময় যখন ঘরে ফিরে আসি, দেখি রেণু ভাত নিয়ে আমার জন্য বসে আছে। বাংলাদেশের রাজনীতির এই চরম দুঃসময়ে অসমাপ্ত আত্মজীবনী কথা বলে উঠে। শেখ মুজিবের অন্ধ বিরোধিতা যারা করেন তারা তো অবশ্যই, এমনকি বঙ্গবন্ধুর নাম ভাঙিয়ে রাজনৈতিক সুবিধাবাদী, স্বার্থান্বেষী চাটুকাদের চোখেও আঙুল দিতে পারে অসমাপ্ত আত্মজীবনীর একটি গভীর পাঠ। বঙ্গবন্ধুর সঠিক আদর্শ এই অসমাপ্ত আত্মজীবনীর স্বচ্ছ আয়নাতেই আমরা দেখতে পাই, জেলের আইবি কর্মকর্তাকে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলে দিচ্ছেন- “সরকারকেই বন্ড দিতে বলবেন, ভবিষ্যতে আর এই রকম অন্যায় কাজ যেনো না করে। আর বিনা বিচারেও যেনো কাউকে বন্দি করে না রাখে।”
লেখকঃ সাবেক ছাত্রলীগ নেতা বর্তমান আয়ারল্যান্ড আওয়ামীলীগ সভাপতি, জননেত্রী সৈনিক লীগ – উপদেষ্টা, বঙ্গবন্ধু পেশাজীবী কল্যাণ পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি, আন্তর্জাতিক বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশন আয়ারল্যান্ড শাখার সভাপতি – ইকবাল আহমেদ লিটন।



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি
Designed By Linckon