১৪ই অক্টোবর, ২০১৮ ইং, রবিবার, ২৯শে আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



সায়েম থেকে সিনহা: ইতিহাসের সন্ধানে


প্রকাশিত :২৫.০৯.২০১৮, ৫:২৩ পূর্বাহ্ণ

সায়েম থেকে সিনহা: ইতিহাসের সন্ধানে

সৈয়দ বোরহান কবীর : সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নতুন বই নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন এখন তপ্ত। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি এই নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। আওয়ামী লীগ বলছে, ‘এই গ্রন্থে (ব্রোকেন ড্রিম) বিচারপতি সিনহা সত্যের অপলাপ করেছেন। নিজের অপকর্ম ঢাকতে এই বই লিখেছেন।’ অন্যদিকে বিএনপি নেতারা বলছেন, ‘সিনহার বই হলো বিচার বিভাগের উপর সরকারের নির্লজ্জ হস্তক্ষেপের এক দলিল।’ দেশের সুশীল সমাজও কম যান না। একজন দেখলাম বলেছেন, ‘এই বই নাকি এক কলঙ্ক উন্মোচন।’

বাঙালি জাতি খুবই ভুলো মনের এক জাতি। আমরা সহজেই অতীত ভুলে যাই। বিচারপতি সিনহা তাঁর বইয়ে কি লিখেছেন, কতটুকু সত্য বা কতটুকু মিথ্যে বলেছেন সে বিষয়ে বাহাসের জন্য এই লেখা নয়। বরং এই ধরনের বই যে অতীতেও লেখা হয়েছে আর সেই বইয়ের আর্তনাদ যে আরও তীব্র সেটি স্মরণ করাতেই এই লেখা।

বাংলাদেশের প্রথম বিচারপতি হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রধান বিচারপতি হিসেবে সায়েমকে নিয়োগ দেন। ১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বর প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং রাষ্ট্রপতি হিসেবে সায়েমকে নিয়োগ দেন খালেদ মোশাররফ। ৭ নভেম্বর কর্নেল (অব.) তাহেরের পাল্টা ক্যু এ নিহত হন খালেদ মোশাররফ। সেনাপ্রধান হন জিয়াউর রহমান। জিয়া ৭ নভেম্বরের ক্যু দেতার মাধ্যমে ক্ষমতার কেন্দ্রে এলেও রাষ্ট্রপতি এবং প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে বহাল রাখেন বিচারপতি সায়েমকে। বঙ্গভবনের দিনগুলো নিয়ে বিচারপতি সায়েম একটি বই লিখেছিলেন যে বইটির শিরোনামে ছিল, ‘অ্যাট বঙ্গভবন: লাস্ট ফেজ’। ১৯৮৮ সালে বইটি প্রকাশিত হয়। ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার ৭ দিনের মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বইটি বাজেয়াপ্ত এবং নিষিদ্ধ করে। ২৭৩ পৃষ্ঠার ঐ বইয়ের পাতায় পাতায় আছে তৎকালীন সেনা প্রধানের স্বেচ্ছাচারিতা, ক্ষমতার অপব্যবহারের চিত্র। বইটির ২৩ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, ‘সংবিধানের ৪ টি মূল স্তম্ভ বাতিল সংক্রান্ত একটি সামরিক ফরমান আমার কাছে স্বাক্ষরের জন্য আসে।… আমি ঐ ফরমানে স্বাক্ষর না করে, তা রেখে দেই। … পরদিন রাত ১১ টায় বুটের শব্দে আমার ঘুম ভাঙ্গে। সেনাপ্রধান জিয়া অস্ত্রশস্ত্রসহ বঙ্গভবনে আমার শয়ন কক্ষে প্রবেশ করে। … জিয়াউর রহমান আমার বিছানায় তাঁর বুটসহ পা তুলে দিয়ে বলেন, সাইন ইট। তাঁর একহাতে ছিল স্টিক, অন্য হাতে রিভলভার’…

বইটির শেষ অধ্যায় নাটকীয়। … ‘জিয়া বঙ্গভবনে আসতেন মধ্যরাতে। অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে। তাঁর সাঙ্গপাঙ্গরা অস্ত্র উঁচিয়ে রাখতো… আমি প্রায়ই মনে করতাম এটাই বোধহয় আমার শেষ রাত। … এক রাতে তিনি এসে একটি কাগজ আমার বিছানায় ছুড়ে দিয়ে বললেন, সাইন ইট… আমি কাগজটা পড়লাম। আমার পদত্যাগ পত্র। যাতে লেখা আছে, ‘অসুস্থতার কারণে আমি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করলাম।’ আমি জিয়াউর রহমানের দিকে তাকালাম। ততক্ষণে আট দশজন অস্ত্রধারী আমার বিছানার চারপাশে অস্ত্র উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। জিয়া আবার আমার বিছানায় পা তুলে আমার বুকের সামনে অস্ত্র উঁচিয়ে বললেন, ‘সাইন ইট’। আমি কোনোমতে সই করে বাঁচলাম…।’

আজ যাঁরা সিনহার জন্য জন্য আর্তনাদ করছেন। যাঁরা বলছেন, বিচারপতি সঙ্গে এহেন আচরণ নজিরবিহীন। যারা সিনহার দুর্নীতি এবং লাম্পট্যকে আড়াল করার জন্য মাতম তুলছেন, তাঁরা দয়া করে বাংলাদেশের প্রথম প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের ‘অ্যাট বঙ্গভবন: লাস্ট ফেজ’ পড়বেন কি?

পরিচিতি: সাংবাদিক

সূত্র : বাংলাইনসাইডার



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি
Designed By Linckon