২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং, বুধবার, ১১ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



১৫ই আগস্ট, ব্যক্তি নয় রাষ্ট্রকেই হত্যার চেষ্টা


প্রকাশিত :১৮.০৮.২০১৮, ২:১৭ অপরাহ্ণ

১৫ই আগস্ট, ব্যক্তি নয় রাষ্ট্রকেই হত্যার চেষ্টা


লেখক : বিশ্লেষক ও গবেষক; চেয়ারম্যান, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৩তম শাহাদাতবার্ষিকীতে তাঁর ও তাঁর পরিবারের যে ১৭ জন সদস্যকে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট হত্যা করা হয়েছিল, তাঁদের স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। অনেকে মনে করে, ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত শত্রুরা তাঁকে সপরিবারে হত্যা করেছিল। আসলে সেদিন ঘাতকরা শুধু একজন শেখ মুজিবকেই হত্যা করেনি, তাদের লক্ষ্য ছিল একটি রাষ্ট্র তথা বাংলাদেশকে হত্যা করা। তারা সাময়িকভাবে কিছুটা সফলও হয়েছিল। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার ছিল বাঙালির মুক্তির সনদ ছয় দফাভিত্তিক। ছয় দফার মধ্যেই নিহিত ছিল পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের তথা নৌকা মার্কার পক্ষে এক অভূতপূর্ব গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছিল। সেই সময় সারা পাকিস্তানে কোনো বামপন্থী রাজনৈতিক দল প্রকাশ্যে রাজনীতি করতে পারত না। যাঁরা বামপন্থী রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাস করতেন তাঁরা মওলানা ভাসানীর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) আর খান আবদুল ওয়ালী খান ন্যাপের আশ্রয়ে রাজনীতি করতেন। মওলানা ভাসানীর ন্যাপ মূলত সমাজতন্ত্রের চীনা সংস্করণে বিশ্বাস করত, আর খান আবদুল ওয়ালী খানের ন্যাপ ছিল সমাজতন্ত্রের রুশ সংস্করণের সমর্থক। খান আবদুল ওয়ালী খান ছিলেন সীমান্ত গান্ধী খান আবদুল গাফ্ফার খানের পুত্র। গাফ্ফার খান কখনো জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্ব মেনে নেননি। প্রথমটিকে বলা হতো চীনপন্থী, আর দ্বিতীয়টিকে মস্কোপন্থী কমিউনিস্টদের দল। পূর্ব বাংলায় মস্কোপন্থীদের নেতৃত্ব দিতেন অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ। এই দুই পন্থীর মধ্যেই আওয়ামী লীগের পর মওলানা ভাসানীর ন্যাপ পূর্ব বাংলার দ্বিতীয় জনপ্রিয় দল ছিল। তাঁর নির্বাচনী প্রতীক ছিল ধানের শীষ আর মস্কোপন্থীদের কুঁড়েঘর। মওলানা ভাসানী সত্তরের নির্বাচন বর্জন করেন। ‘ভোটের বাক্সে লাথি মারো’ বলে রাস্তায় নেমে পড়েন। মস্কোপন্থী ন্যাপের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার মতো তেমন শক্তি ছিল না। তবে তাঁরা সত্তরের নির্বাচনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেননি। অন্যদিকে মওলানা ভাসানী নির্বাচন বর্জন করলেও নির্বাচনের পর তিনি নিজে বঙ্গবন্ধুকে সমর্থন করেন এবং মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে মুজিবনগর সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে যোগদান করেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হলে বঙ্গবন্ধু সরকার বামপন্থী সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রকাশ্যে রাজনীতি করার সুযোগ করে দেয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরই কমিউনিস্ট পার্টির প্রকাশ্যে পথচলা শুরু হয়। এই সত্যটা কদাচিৎ কোনো বামপন্থী নেতারা উচ্চারণ করেন।

সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে মুসলিম লীগ (একাধিক অংশ), জামায়াতে ইসলামী, পাকিস্তান পিপলস পার্টি, নেজামে ইসলাম অংশগ্রহণ করে। সেই নির্বাচনে পাকিস্তানের গণপরিষদে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯টি আসনের ১৬৭টিতে জয়লাভ করে। ভোট পায় ৭৫ শতাংশ। অর্থাৎ ২৫ শতাংশ ভোটার নৌকা মার্কায় ভোট দেয়নি এবং ছয় দফাকে সমর্থন করেনি। উল্লেখ্য, সেই নির্বাচনে পূর্ব বাংলায় মোট ভোটারের ৯৪.৪ শতাংশ ভোট দেয়। যে দুটি আসন আওয়ামী লীগ হারিয়েছিল তার একটি ছিল ময়মনসিংহে। সেখানে বিজয়ী হয়েছিলেন মুসলিম লীগের নুরুল আমিন আর অন্যটি পাবর্ত্য চট্টগ্রামে, যেখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী হয়েছিলেন চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়। ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে নুরুল আমিনকে হারিয়েছিলেন তরুণ ছাত্রনেতা যুক্তফ্রন্টের খালেক নেওয়াজ। তখন নুরুল আমিন শুধু মুসলিম লীগের একজন জাঁদরেল নেতাই ছিলেন না, তিনি পূর্ববঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীও ছিলেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগেই নুরুল আমিন পাকিস্তানে পালিয়ে যান এবং ইয়াহিয়া খানের পদত্যাগের পর জুলফিকার আলী ভুট্টো পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি হলে তাঁকে উপরাষ্ট্রপতি করা হয়। মৃত্যুর পর নুরুল আমিনকে জিন্নাহর সমাধির অভ্যন্তরে কবর দেওয়া হয়। ঠিক একইভাবে রাজা ত্রিদিব রায়কে ভুট্টো পর্যটনমন্ত্রী করেন এবং বঙ্গবন্ধু-হত্যা পরবর্তীকালে জিয়া ক্ষমতা দখল করলে ত্রিদিব রায়ের স্ত্রী রাজমাতা বিনীতা রায়কে তাঁর উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য করে নেন। সত্তরের নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে এটি বলা যায়, পূর্ব বাংলার সব বাঙালি ছয় দফার পক্ষে সমর্থন দেয়নি এবং বাংলাদেশ স্বাধীন হোক এটাও চায়নি। আর এটাও সত্য, যাঁরা আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করেছিল তাঁদেরও অনেকে পরবর্তী সময় ঈমান ঠিক রাখতে পারেননি। যেমন—খন্দকার মোশতাক এবং বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরে যাঁরা মোশতাকের মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছিলেন তাঁদের অনেকেই। অন্যদিকে যাঁরা সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে সমর্থন করেননি, তাঁদের অনেকেও আবার মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তাতে অংশগ্রহণ করেন অথবা তাঁকে পরোক্ষভাবে সমর্থন করেন।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে যখন এটি পরিষ্কার হয়ে যায় যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অনিবার্য, তখন বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধীরা দেশটির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করে। তাঁদের প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করে পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই। সহযোগিতা করে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ। এই ষড়যন্ত্রকারীদের মধ্যমণি হিসেবে বেছে নেওয়া হয় বঙ্গবন্ধুর একান্ত ঘনিষ্ঠজন খন্দকার মোশতাককে। ষড়যন্ত্রকারীদের মধ্যে যেমন ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ তাঁর কিছু রাজনৈতিক সহচর, ঠিক তেমনি ছিলেন কিছু চীনপন্থী বাম নেতা, যাঁদের মধ্যে আবদুল হক, তোয়াহা, আলাউদ্দিন ও আবদুল মতিন অন্যতম। আবদুল হক তো ভুট্টোর কাছে বঙ্গবন্ধু সরকারকে উত্খাত করার জন্য অর্থ ও অস্ত্র সাহায্য চেয়ে চিঠি লিখেছিলেন। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, একটি দেশের অথবা তার গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের বিরুদ্ধে কোনো বড় ধরনের ষড়যন্ত্র কার্যকর করতে হলে সঙ্গে যদি অন্দরমহলের কেউ থাকে, তাহলে কাজটি অনেক সহজ হয়। বঙ্গবন্ধু হত্যার পেছনে যে ফারুক-রশীদ গং সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন, তাঁরা সবাই এসেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের একেবারে শেষ সময়ে। অক্টোবর আর নভেম্বর মাসে। তাঁরা আইএসআইয়ের ব্রিফ নিয়ে এসেছিলেন বলে ধারণা করা হয়। এবং তাঁরা প্রায় সবাই বঙ্গবন্ধু পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। তাঁরা সবাই চাকরি সূত্রে জিয়ার পূর্বপরিচিত ছিলেন। জিয়া যদিও মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর স্ত্রী সব সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আস্থাভাজন ছিলেন। খালেদা জিয়াকে তাঁর স্বামী একাধিকবার ভারতে নিয়ে যেতে লোক পাঠানো সত্ত্বেও তিনি তাঁদের সঙ্গে ভারত যেতে অস্বীকার করেন। বলেন, তিনি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হেফাজতে ভালোই আছেন। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ এবং মুক্তিযুদ্ধ শুরুর সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও আমার বন্ধু মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) শওকত এই ঘটনার সাক্ষী। অক্টোবর-নভেম্বর মাসের শেষ দিকে যেসব সেনা সদস্য পাকিস্তান থেকে পালিয়ে ভারতে এসেছিলেন, তাঁরা কেউ সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি।

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ষড়যন্ত্রের প্রথম আলামত দেখা যায় একাত্তরের সেপ্টেম্বর মাসে, যখন খন্দকার মোশতাক কুমিল্লা থেকে নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্য জহুরুল কাইউমকে কলকাতায় নিযুক্ত মার্কিন কনসাল জেনারেলের কাছে পাঠান এই সংবাদ দিয়ে, পাকিস্তান যদি বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেয় তাহলে তিনি মুক্তিযুদ্ধ বন্ধ করতে সব ধরনের ব্যবস্থা নেবেন। তবে মার্কিন কনসাল জেনারেল জানতেন তত দিনে প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ মোশতাকের কুমতলব বুঝতে পেরে তাঁকে গুরুত্বহীন করে রেখেছিলেন। বিষয়টা যদিও কলকাতায় আর খুব বেশি অগ্রসর হয়নি, কিন্তু ষড়যন্ত্র থেমে থাকেনি। দেশ স্বাধীন হলে ষড়যন্ত্রটা আরো গভীর হওয়া শুরু করে এবং মূল লক্ষ্য হচ্ছে স্বাধীন অসম্প্রদায়িক বাংলাদেশকে একটি মিনি পাকিস্তানে রূপান্তর করা। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু যুদ্ধকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল ওসমানীকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করে নেন এবং শফিউল্লাহকে সেনাপ্রধান করেন। শফিউল্লাহ ছিলেন জিয়ার জুনিয়র। এতে জিয়া বঙ্গবন্ধুর ওপর ক্ষুব্ধ হন। বঙ্গবন্ধু জিয়াকে পুত্রবৎ স্নেহ করতেন এবং যখন যুদ্ধ শেষে জিয়ার ঘর ভেঙে যাওয়ার মতো অবস্থা হয় তখন তা বঙ্গবন্ধুর সরাসরি হস্তক্ষেপে রক্ষা পায়। বঙ্গবন্ধু অনেকটা জিয়াকে খুশি করার জন্য তাঁর জন্য সেনাবাহিনীতে ডেপুটি চিফের একটি পদ সৃষ্টি করেন। কিন্তু জিয়া মনে করতেন তাঁর প্রতি অবিচার করা হয়েছে। ষড়যন্ত্রকারীরা তাদের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য জিয়াকে কাজে লাগায়। পঁচাত্তরের মার্চ মাসে কর্নেল ফারুক রহমান জিয়ার কাছে গিয়ে বলেন, তাঁরা সরকার পতনের একটি পরিকল্পনার বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছেন এবং তাতে তাঁরা জিয়ার সমর্থন প্রত্যাশা করেন। জিয়া তাঁদের গ্রিন সিগন্যাল দেন, তবে বলেন, পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সময় তিনি মাঠে থাকবেন না। এরই মধ্যে ষড়যন্ত্রকারীরা মার্কিন সরকার ঘনিষ্ঠ আমলা মাহবুব আলম চাষী, বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার তথ্য প্রতিমন্ত্রী তাহেরউদ্দিন ঠাকুরসহ আরো কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে তাদের দলে অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছে। ফেব্রুয়ারি-এপ্রিল মাস থেকে যোগাযোগ স্থাপিত হয় ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের সঙ্গে। ষড়যন্ত্রকারীরা ঘন ঘন বৈঠক করেছে কুমিল্লার পল্লী উন্নয়ন একাডেমিতে। ১৫ই আগস্টের আগেই রাষ্ট্রের নিরাপত্তা সংস্থার কর্তাব্যক্তিদের সরিয়ে সেখানে বসানো হয়েছে একাত্তরে পাকিস্তান সরকারের একান্ত আস্থাভাজন ব্যক্তিদের। বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সবাই হয় পাকিস্তান ফেরত অথবা একাত্তরে পাকিস্তান সরকারের আস্থাভাজন ছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে আসন্ন বিপদ সম্পর্কে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ আর সোভিয়েত ইউনিয়নের গোয়েন্দা সংস্থা ‘কেজিবি’ একাধিকবার সতর্ক করে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু কখনো তাদের কথা বিশ্বাস করেননি। এটি ছিল তাঁর একটি ঐতিহাসিক ভুল। বাংলাদেশের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থাও বঙ্গবন্ধুকে সতর্ক করে চিরকুট পাঠায়। প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা মেজর জিয়াউদ্দিন (সুন্দরবন খ্যাত) তখন এই সংস্থায় কর্মরত ছিলেন। তিনি একাধিকবার তাঁর সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তাদের পাঠানো চিরকুট কখনো বঙ্গবন্ধুর হাতে পৌঁছায়নি। এসবেরই প্রেক্ষাপট ঘটে ১৫ই আগস্টের হত্যাকাণ্ড। শুরু হয় বাংলাদেশের উল্টোপথের যাত্রা।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর যখন ঢাকা বেতার থেকে সংবাদটি খুনি চক্রের অন্যতম সদস্য মেজর ডালিম ঘোষণা করে বিদেশে প্রথম সংবাদটি প্রচার করে পাকিস্তান রেডিও এবং বলে ‘শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে এবং বাংলাদেশকে ইসলামিক রিপাবলিক ঘোষণা করা হয়েছে’। খুনি মোশতাক সরকারকে প্রথম স্বীকৃতিটাও দেয় পাকিস্তান। ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ দ্রুত রূপান্তর হতে থাকে একটি ধর্মান্ধ রাষ্ট্রে। ‘বাংলাদেশ বেতার’ হয়ে যায় ‘রেডিও বাংলাদেশ’ আর ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের পরিবর্তে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ স্লোগান চালু হয়। মোশতাক ঘোষণা করেন, বাংলাদেশের জাতীয় পোশাক হবে ‘শেরওয়ানি আর মোশতাক টুপি’। ৮৬ দিনের মাথায় জিয়া মোশতাককে সরিয়ে ক্ষমতা দখল করলে সংবিধানের ‘মুসলমানীকরণ’ শুরু হয়। ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদের’ পরিবর্তে জিয়া প্রবর্তন করেন ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’। ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ বাতিল করা হয়। বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রবর্তনের নামে জিয়া জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলাম অর্থাৎ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী সব দলকে, সাংবিধানিকভাবে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রকাশ্যে রাজনীতি করার সুযোগ করে দেন এবং তাদের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন। একাত্তরের ঘাতক গোলাম আযম বাংলাদেশে ফিরে এসে জামায়াতের রাজনীতি পুনর্গঠন করেন। অর্থাৎ দেশটা সম্পূর্ণরূপে একটি মিনি পাকিস্তানের রূপ ধারণ করে, যা বঙ্গবন্ধুর ঘাতকরা চেয়েছিল।

১৯৭৫ থেকে শুরু করে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ বস্তুতপক্ষে একটি মিনি পাকিস্তান হিসেবে কার্যকর ছিল। এতে যেমন অবদান ছিল জিয়ার, তেমনভাবে অবদান ছিল এরশাদ আর খালেদা জিয়ার। তবে জিয়া আর তাঁর স্ত্রীর অবদান ছিল সবচেয়ে বেশি। জিয়া শাহ আজিজের মতো একজন শীর্ষস্থানীয় রাজাকারকে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী আর আব্দুল আলীমের মতো একজন কসাইকে মন্ত্রী বানিয়েছিলেন। অন্যদিকে এরশাদ মাওলানা মান্নান আর সাকা চৌধুরীর মতো ঘাতকদের তাঁঁর মন্ত্রিসভায় ঠাঁই করে দিয়েছিলেন। আর খালেদা জিয়া যুদ্ধাপরাধী মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে তাঁর মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত করেছিলেন। খুনি কর্নেল রশীদকে জাতীয় সংসদেও সদস্য করে নিয়ে আসেন (ফ্রিডম পার্টি)। এই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের সার্বিক চরিত্রটাই পাল্টে গিয়েছিল। এই সময়ে দেশে এমন একটি প্রজন্ম সৃষ্টি হয়েছিল, যে প্রজন্মের তরুণীরা পাকিস্তানি ক্রিকেটার শহীদ আফ্রিদিকে বিয়ে করার জন্য বাংলাদেশ-পাকিস্তান ক্রিকেট খেলার সময় বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে ব্যানার নিয়ে বসে থাকত। ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা তাঁর পিতার মৃত্যুর ২১ বছর পর সরকার গঠন করলে পরিস্থিতি পাল্টাতে থাকে। তবে তাঁকে যেতে হবে অনেক দূর এবং এটা এখন পরিষ্কার যে তাঁর পথে বাধা সৃষ্টি করতে দেশে নিরন্তর ষড়যন্ত্র চলমান। এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যারা জড়িত তারা সবাই বাইরের মানুষ তা কিন্তু নয়। রাষ্ট্রের প্রশাসনে থাকুক বা দলের ভেতর, তাদের যদি বঙ্গবন্ধুকন্যা চিনতে ভুল করেন তাহলে আবারও একটি বিপর্যয় অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে। নাগালের মধ্যে যাদের অবস্থান তাদের অনেক সময় চেনা যায় না। বঙ্গবন্ধু চিনতে পারেননি বলে জাতিকে ২১ বছর খেসারত দিতে হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা পিতার ভুলের পুনরাবৃত্তি করবেন না বলে সবার প্রত্যাশা। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি
Designed By Linckon