৫ই ডিসেম্বর, ২০১৮ ইং, বুধবার, ২১শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বর্ণের ভল্টে যারা ঢুকতে পারেন


প্রকাশিত :২০.০৭.২০১৮, ৬:০৫ অপরাহ্ণ

বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে গচ্ছিত কিছু স্বর্ণের পরিমাণ ও ধরন বদলে গেছে বলে তুলকালাম কাণ্ড শুরু হয়েছে বাংলাদেশে। অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান সেনিয়ে বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানের সাথে জরুরি বৈঠকের পর বলেছেন, “আমি খবরটি পড়ে আঁতকে উঠেছি।”

তিনি আরও বলেছেন, “সামান্যতম সংশয় বা সন্দেহ থাকলে সেটা যেন দূরীভূত হয়, যদি কোন গাফিলতি ঘটে থাকে, ঘুণাক্ষরেও ঘটে থাকে, সেটা দেখার দায়িত্ব বাংলাদেশ সরকারের।”

বাংলাদেশের একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত একটি খবর নিয়ে বিতর্কের শুরু।

কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের গচ্ছিত স্বর্ণ কোথা থেকে আসে?
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ পলিসি ডিপার্টমেন্টের জেনারেল ম্যানেজার মোহাম্মদ খুরশিদ ওয়াহাব জানিয়েছেন, দেশের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ভল্টে ঢোকার অধিকার রয়েছে শুধুমাত্র জব্দ হওয়া স্বর্ণের।

তিনি বলছেন, “কাস্টমস বা অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থা চোরাচালান বা চুরি-ডাকাতির যে স্বর্ণ আটক করে, সেগুলো কোর্টের নির্দেশক্রমে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সংরক্ষণ করে থাকে।”

এই গচ্ছিত স্বর্ণ পরে কি হয়?
যখন ঐ সংস্থাগুলো স্বর্ণ বার, গয়না বা অন্য কোন মূল্যবান ধাতু রাখতে আসে সেটিকে অস্থায়ী ভাবে জমা গ্রহণ করা হয়।
ভল্টে সোনার বারগুলো এভাবেই সাজিয়ে রাখা হয়।
আরও পড়তে পারেন:
সরকারি চাকুরিতে কোটা কি রাখতেই হবে?

তিন তালাক: শ্বশুরের সাথে রাত কাটায় শাহবিনা

উদ্ধার হওয়ার পর হাসপাতাল ছেড়েছে থাই কিশোররা

যখন আদালতের নির্দেশ আসে যে রাষ্ট্রের অনুকূলে এই স্বর্ণ বাজেয়াপ্ত করা হল তখন সেটি বিক্রি করে তার অর্থ সরকারকে দিয়ে দেয়া হয়।

রাষ্ট্রের অনুকূলে বিষয়টি কোর্টে নিষ্পত্তি হলে, এমন স্বর্ণ যদি বার আকারে থাকে, বলা হয় তা প্রায় ৯৯% খাটি, তা আসলে ক্রয় করতে পারে শুধুমাত্র বাংলাদেশ ব্যাংক নিজে।

তা ক্রয় করে সরকারকে অর্থ দিয়ে দেয়া হয়। কোর্টে নিষ্পত্তি হয়না যে স্বর্ণের সেগুলো অস্থায়ীভাবে জমা থাকে।

এরকম কত স্বর্ণ বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা হয়?
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১৩ সাল খেতে ২০১৫ পর্যন্ত সর্বশেষ হিসেব দিতে পেরেছে। সংস্থাটি। সে সময় ভল্টে তদন্তাধীন স্বর্ণ গচ্ছিত ছিল ৯৩৬ কেজি যা প্রায় এক টনের কাছাকাছি। যার মধ্যে ছিল সোনার বার ও গয়না। গচ্ছিত স্বর্ণ যদি গয়না হয় তবে কোর্টে নিষ্পত্তির পর সেটি স্বর্ণকারেরা কিনতে পারে।

গচ্ছিত স্বর্ণের নিরাপত্তা দেয়া হয় কিভাবে?
যে বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে তা হল ২০১৫ সালে গচ্ছিত প্রায় ৩৫০ কেজি স্বর্ণ নিয়ে। যে প্রতিবেদনটির মাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে এতটা আলাপ হচ্ছে তাতে বলা হয়েছে ঐ স্বর্ণ ছিল চাকতি ও আংটি কিন্তু তা পাওয়া গেছে মিশ্র ধাতু আকারে।

আর ঐ স্বর্ণ ছিল ২২ ক্যারেট কিন্তু তদন্তে পরীক্ষার পর নাকি তা হয়ে গেছে ১৮ ক্যারেট। গচ্ছিত বেশিরভাগ স্বর্ণের ক্ষেত্রেই নাকি অসামঞ্জস্য পাওয়া গেছে। গণমাধ্যমে এমনটাই এসেছে।
ব্যাংকে সোনার বার ছাড়াও এ ধরনের অনেক গয়নাও রাখা হয়।
কিন্তু এসব স্বর্ণের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আসলে কেমন?
যে স্বর্ণ নিয়ে বিতর্ক তখন ক্যাশের দায়িত্বে ছিলেন মোহাম্মদ খুরশিদ ওয়াহাব। তিনি জানিয়েছেন, বাংলাদেশে ব্যাংকে ৭০ জন পুলিশের একটি কন্টিনজেন্ট রয়েছে যারা অন্য কোথাও পাহারায় যায়না, তারা টাকশাল থেকে টাকাও আনতে যায় না। তারা শুধু এখানেই সার্বক্ষণিক পাহারা দেয়।

ভল্ট এলাকাকে বাংলাদেশে ব্যাংকের ভাষায় ‘মহা নিরাপত্তা এলাকা’ বলা হয়। স্বর্ণের যে ভল্ট সেখানে ঢুকতে গেলে ছয় স্তরের নিরাপত্তা ও গেটি কিপিং পার হতে হয়।

শুরুতে পাঞ্চ কার্ড, তার পর কলাপসিবল গেট যেখানে দেহ তল্লাসি হবে। স্বর্ণ বা বুলিয়ন ভল্ট পর্যন্ত তিনটি ভল্টের দরজা রয়েছে।

আর সেই ভল্টে আলাদা আলমারির গুলোর আলাদা আলাদা চাবি। কিন্তু সেই চাবিও আবার সিন্দুকে রাখা হয়। আর তার দায়িত্বে থাকেন মাত্র দুজন।

এই পুরো প্রক্রিয়ার বর্ণনা দিয়ে মোহাম্মদ খুরশিদ ওয়াহাব বলছেন, “রাত্রে ভল্ট বন্ধ করে যাবার পর এমনকি গভর্নর এসে ঢুকতে চাইলেও তাকে পুলিশ ঢুকতে দেবে না।”
সাইবার জালিয়াতির মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে অর্থ চুরির ঘটনায় তোলপাড় হয়েছিলো সারা বিশ্বের ব্যাংকগুলোতেই
স্বর্ণের ভল্টে ঢোকার অধিকার তাহলে কাদের রয়েছে?
মোহাম্মদ খুরশিদ ওয়াহাব বলছেন, “এখানে ঢোকার অধিকার রয়েছে শুধু কারেন্সি অফিসার, জয়েন্ট ম্যানেজার বুলিয়ন (স্বর্ণ), জয়েন্ট ম্যানেজার ক্যাশ এবং ডিজিএম ক্যাশ। এরাই শুধু ঢুকতে পারেন। কারেন্সি অফিসার যদি প্রয়োজন মনে করেন তবে তার অনুমতি যিনি পাবেন তিনি শুধু যান। এখানে গভর্নর বা ডেপুটি গভর্নর এবং সরকারের অন্যান্য কর্মকর্তারা , অননুমোদিত ব্যক্তিদের যাওয়ার কোন অধিকার নেই, প্রয়োজনও নেই।”

কিন্তু এতসব নিরাপত্তার ফাঁক গলিয়ে স্বর্ণ নিয়ে গরমিলের যে অভিযোগ আসছে সেটি সম্পর্কে বাংলাদেশে ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলছেন, “আমি এটিকে এখনো পর্যন্ত অভিযোগই বলবো। কিন্তু যদি এমন কিছু যদি সত্যিই হয়ে থাকে তবে বাংলাদেশে ব্যাংকে ভীষণ খারাপ দিন যাচ্ছে।”

“আমি বলবো এর পুরো ওভারহলিং দরকার। মানুষের মনে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্পর্কে সন্দেহ বেড়ে গেছে।”

২০১৬ সালে ফেব্রুয়ারি প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে প্রায় দশ কোটি দশ লক্ষ ডলার চুরি হয়েছিলো। যাকে বলা হয় আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে বড় ব্যাংক তহবিল লোপাট বা রিজার্ভ চুরির ঘটনা। সেই অর্থ পুরোটা এখনো উদ্ধার হয়নি।



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি
Designed By Linckon