২১শে নভেম্বর, ২০১৮ ইং, বুধবার, ৭ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



দেশি-বিদেশি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে সমৃদ্ধির পথে বাংলাদেশ :প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা


প্রকাশিত :০৬.০৭.২০১৮, ৪:১৩ পূর্বাহ্ণ

দেশি-বিদেশি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে সমৃদ্ধির পথে বাংলাদেশ :প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বলেছেন, দেশি-বিদেশি নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে উন্নয়ন, অগ্রগতি আর সমৃদ্ধির পথে হাঁটছে বাংলাদেশ। ৪২ বছর স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় থাকার পর বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশের কাতারে শামিল হওয়ার স্বীকৃতি পেয়েছে। আমরা সমুদ্র থেকে মহাকাশে গেছি। বাংলাদেশ মাত্র ৯ বছরের মধ্যে যে উন্নয়ন করেছে সেই উন্নয়নে বিশ্ব আজ বিস্মিত। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ হতে আজকের এই উত্তরণ, যেখানে রয়েছে এক বন্ধুর পথ পাড়ি দেয়ার ইতিহাস। আওয়ামী লীগ সরকারের জনকল্যাণমূলক অর্থনৈতিক উন্নয়ন উদ্যোগ বাস্তবায়নের কারণে বাংলাদেশের এই উন্নয়ন এবং অদম্য অগ্রযাত্রা সম্ভব হয়েছে। গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য বেগম ফজিলাতুন নেসা বাপ্পির প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। এ সময় অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। প্রতিটি ক্ষেত্রে উন্নয়ন করে যাচ্ছি

জাতীয় পার্টির (এ) ফখরুল ইমামের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি জাতিসংঘের মহাসচিব ও বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফরের কথা তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়নে বিশ্ব আজ বিস্মিত। বিশ্বের সবার দৃষ্টি এখন বাংলাদেশের দিকে। আর সে কারণেই সবাই বাংলাদেশে আসছেন। তিনি বলেন, আগে বাংলাদেশ মানেই ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে চলা দেশ হিসেবে বুঝতো। আমরা এখন আর ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে ঘুরি না, ভবিষ্যতেও ঘুরবো না। আমরা দেশকে উন্নত করতে চাই। প্রতিটি ক্ষেত্রে আমরা উন্নয়ন করে যাচ্ছি। জাতির পিতা দেশকে স্বাধীন করে গেছেন, আমরা দেশকে দারিদ্র্র্যমুক্ত করতে চাই।

সাহায্য নয়, বিনিয়াগ চাই

দৃঢ় কণ্ঠে বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন, ভিক্ষা অনুদান এ শব্দগুলো আমি বদলে ফেলতে চাই। বাংলাদেশ এখন আর সাহায্য চায় না, বিনিয়োগ চায়। এটি দেশের ধারাবাহিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রতিফলন ও স্বীকৃতি। জাতি হিসেবে আমাদের একটি বড় অর্জন। আশা করছি, অচিরেই আমরা উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবো। সমৃদ্ধির আগামীর পথে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় দীর্ঘমেয়াদি প্রেক্ষিত পরিকল্পনা রূপকল্প-২০৪১ প্রণয়নের কাজ আমরা শুরু করেছি। ২০৪১ সালে আমরা হবো সুখী, সমৃদ্ধ একটি উন্নত দেশ।

এমপিওভুক্তির কাজ দ্রুত গ্রহণ করা হবে

জাতীয় পার্টির (এ) ফখরুল ইমামের মূল প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, আওয়ামী লীগ সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নের লক্ষ্যে সারা দেশে ১ হাজার ৬২৪টি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হয়েছে। ফলে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিপুল সংখ্যক শিক্ষক-কর্মচারীর কর্মসংস্থানসহ শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। অবশিষ্ট নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সুনির্দিষ্ট নীতিমালার ভিত্তিতে এমপিওভুক্ত করার লক্ষ্যে ইতোমধ্যে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (স্কুল ও কলেজ) জনবল কাঠামো এবং এমপিও নীতিমালা-২০১৮ জারি করা হয়েছে। উল্লিখিত নীতিমালার অনুসরণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির বিষয়ে দ্রুত কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে। এ লক্ষ্যে অনলাইন দরখাস্ত গ্রহণ ও ব্যবস্থাপনা এবং বিধিমতে প্রতিষ্ঠান বাছাইয়ের জন্য পৃথক দুটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

১৭৯টি বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং ২৯৮টি কলেজ সরকারিকরণের কার্যক্রম চলছে

প্রধানমন্ত্রী জানান, জাতির পিতা ১৯৭৩ সালে ৩৭ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করেছিলেন। এরপর দীর্ঘ ২১ বছর একটি প্রাথমিক বিদ্যলয়ও জাতীয়করণ করা হয়নি। আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করার পর জাতির পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে আমি ২৬ হাজার ৩৭০টি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করেছি। এতে ১ লাখ ৪ হাজার শিক্ষকের চাকরি সরকারিকরণ করা হয়েছে। এছাড়া দেশের মোট ১৪২টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং ৪০টি কলেজ সরকারি করা হয়েছে। আরও ১৭৯টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং ২৯৮টি কলেজ সরকারিকরণের কার্যক্রম চলছে।

মানবিক কারণে ১১ লাখ নির্যাতিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়েছি

সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নুরজাহান বেগমের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানবিক কারণে আমরা প্রায় ১১ লাখ নির্যাতিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়েছি। তাদের বাসস্থান, চিকিত্সা, তাদের খাদ্যের ব্যবস্থাসহ সব রকম ব্যবস্থা করেছি। আমাদের সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও তাদের সকল মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য সর্বপ্রকার ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। আমরা মনে করি যে, রোহিঙ্গা সমস্যার শুরু মিয়ানমারে এবং সমাধানও মিয়ানমারকেই করতে হবে। তাই রোহিঙ্গাদের নিজ মাতৃভূমিতে নিরাপদ, সম্মানজনক ও টেকসই প্রত্যাবর্তনের জন্য আমরা মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে আসছি। রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। চুক্তি বাস্তবায়নে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থাকেও সম্পৃক্ত করা হয়েছে।

বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে হাওয়া ভবনের নামে তারেক রহমান লুটপাট চালায়

প্রধানমন্ত্রী বলেন, একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে দেশের অগ্রযাত্রা থমকে দাঁড়ায়। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসে। আবার দুর্নীতির চক্রে নিপতিত হয় দেশ। হাওয়া ভবনের নামে তারেক রহমান চালাতে থাকে লুটপাট। অর্থনৈতিক উন্নয়ন সূচকের প্রায় সবগুলোতেই বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়তে থাকে। এদেশে জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাস, মাদক এগুলো কারা সৃষ্টি করে গেছে। দুর্নীতিকে কারা নীতি করেছে? দেশকে পাঁচবার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন কারা করেছে? বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল তারাই এসব করেছে।

পদ্মা সেতুসহ ১০ মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন চলছে

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা এমন পর্যায়ে উন্নীত করতে সক্ষম হয়েছি যে, পদ্মা সেতুর মতো বৃহত্ প্রকল্প নিজেদের অর্থায়নে বাস্তবায়ন করছি। পদ্মা সেতুসহ আমরা ১০টি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছি। এছাড়া আমার নিজস্ব চিন্তাপ্রসূত ১০টি বিশেষ উদ্যোগেরও বাস্তবায়ন করছি, যা ‘শেখ হাসিনার ১০টি বিশেষ উদ্যোগ’ নামে পরিচিত। এগুলো হলো-একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প, আশ্রয়ণ প্রকল্প, ডিজিটাল বাংলাদেশ, শিক্ষা সহায়তা কর্মসূচি, নারীর ক্ষমতায়ন, ঘরে ঘরে বিদ্যুত্, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, বিনিয়োগ বিকাশ ও পরিবেশ সুরক্ষা।

শিক্ষাই একমাত্র হাতিয়ার

প্রধানমন্ত্রী বলেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা পড়ে, সেখানে কয় টাকা খরচ করে? সিট ভাড়া ২৫ টাকা, খাবার ৩০ টাকা। তারপরেও আমরা লেখাপড়ার খরচ চালিয়ে যাচ্ছি। আমরা চাই আমাদের ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে। দেশটা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন করে দিয়ে গেছেন। জাতির পিতার স্বপ্ন দারিদ্র্যমুক্ত দেশ আমরা করতে চাই। তা করতে হলে শিক্ষাই একমাত্র হাতিয়ার।

জেলে বসে দিনবদলের ইশতেহার লিখেছি

সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে গ্রেপ্তারের পর কারাগারে বসে শেখ হাসিনা পরিকল্পনা করেছিলেন দিনবদলের সনদের। আর ক্ষমতায় এসে সেটারই বাস্তবায়ন করছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘২০০৭ সালে আমাকে গ্রেপ্তার করা হয়। আমাকে তখন রাজনীতি থেকে বিতাড়নের ষড়যন্ত্র চলছিল। কিন্তু জেলখানায় বসে ক্ষমতায় গেলে দেশের উন্নয়নে কী করতে হবে, সেই ইশতেহারের পয়েন্ট আমি লিখে রাখি। পরে তা নির্বাচনের সময় দিনবদলের ইশতেহারে যোগ করি।’

অনুষ্ঠানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট সচিববৃন্দ বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন এবং পরে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের সচিববৃন্দ এই চুক্তির একটি করে কপি প্রধানমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করেন। এবারই প্রথম অনুষ্ঠানে সিনিয়র সচিব ও সচিব পর্যায়ে শুদ্ধাচার পুরস্কার ২০১৭-১৮ প্রদান করা হয়। বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের সচিব মো. মফিজুল ইসলাম প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে এই পুরস্কার গ্রহণ করেন।

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ইসমত আরা সাদেক, মন্ত্রী পরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. নজিবুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক মো. আবুল কালাম আজাদ অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। মন্ত্রী পরিষদ বিভাগের সচিব (সংস্কার ও উন্নয়ন) এনএম জিয়াউল আলম, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের সচিব মো. মফিজুল ইসলামও অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। অনুষ্ঠানে মন্ত্রী পরিষদ সদস্যবৃন্দ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাবৃন্দ, সচিববৃন্দ, বিভিন্ন বিভাগ ও দপ্তরের প্রধানগণ এবং বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি
Designed By Linckon