২৩শে জানুয়ারি, ২০১৮ ইং, মঙ্গলবার, ১০ই মাঘ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ



আমি জন্ম নেওয়া শহীদদের গ্রাম থেকে বলছি


প্রকাশিত :০৫.০১.২০১৮, ৪:৩৯ অপরাহ্ণ

আমি জন্ম নেওয়া শহীদদের গ্রাম থেকে বলছি

১৯৭১! মুক্তিযোদ্ধ! বিটঘর! তিনটা শব্দ মিলে একটা আতঙ্কের নাম। ১৯৭১ সালের ২৯ অক্টোবর রোজ শুক্রবার। রমজান মাস ছিল। ছোট একটি গ্রামে হিন্দু মুসলিম এর ছোট ছোট করে কয়েকটি পরিবার বাস করত। সারা বাংলাদেশে ঐ দিকে চলছিল তুমুল যুদ্ধ। অভাব অনটনের মধ্যেই হিন্দু-মুসলিম মিলে ছোট গ্রামটিতে চলত রাত জেগে আড্ডা। গ্রামে একটি রেডিও ছিল। দিন শেষে সন্ধ্যায় এই রেডিওটির জায়গা হতো কোন এক চায়ের দোকানে অথবা কোন এক গ্রাম্য জলসায়। অপেক্ষা করত কখন এই ন্যাকারজনক মুক্তিযোদ্ধ থেকে বাংলাদেশ মুক্তি পাবে। কবে এই গ্রামটাতে একটি সবুজ-লাল পাতাকা উড়াতে পারবে। কবে অশ্রু জড়া কণ্ঠে বলতে পারবে আমার এই গ্রাম স্বাধীন, আমার এই দেশ স্বাধীন। অপেক্ষায় চলছিল দিনগুলি। সেই সবুজ-লাল পতাকার স্বপ্ন দেখা গ্রাম্য লোকগুলোর কাছে এসেছিল শুক্রবারের সেই ২৯ অক্টোবর ১৯৭১ সালের দিনটি। মধ্য রাত্রে গ্রামের কিছু লোক উচ্চ স্বরে আহব্বান করছিল জেগে উঠো, সেহরী খাও, রোজা রাখ, নামাজ পড়। কিন্তু সকাল হওয়ার সাথে সাথে ঐ দিনের সকালের সূর্যটা নাকি একটু লাল বেশিই হয়েছিল। কয়েক শত পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আক্রমন করে বসে এই গ্রামে। ঘর থেকে বের করে নিয়ে আসছে সব যুবকদের। যারা একটু হাত জোড় করে বেরিয়ে আসতে যারা চাচ্ছিল না তাদের মাথায়, চোখে, ঘাড়ে, বুকে, পিঠে গুলি করা হয়েছে। আর যাদের বিশ্বাস ছিল আমরাতো ওদের মতই মানুষ। ওরা আমাদের মারবে না। হয়তো কিছুই বলবে। মা-বাবাকে বুজিয়ে বলছে, “মা ওরা আমায় মারবে না, যাই আমি, কেঁদো না মা।” অপায়া এই দিনটি এমন অলক্ষী মাখা ছিল যে, গ্রামের সহজ সরল মানুষগুলির সেই স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখা মানুষগুলির কণ্ঠ বন্ধ করে দিয়েছিল। মানুষগুলিকে হাত জোড় করে বাঁচার আকুতির পরও বাঁচতে দেয় নি। কণ্ঠ থেকে নাকি বের হচ্ছিল আমরা বাঁচতে চাই। হিন্দুরা বলছিল আমরা হিন্দু হতে পারি কিন্তু ভাই আমরা তো মানুষ। এই দেখ আমাদের চামড়া তোমাদের মতই। মুসলিমরা বলছিল আমরা তোমাদের জাত ভাই। আমাদের কে কেন মারছ? এক বৃদ্ধ মা-বাবা গুলো ভাঙ্গা ভাঙ্গা স্বরে উচ্চারন করেছিল আমার একটাই ছেলে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ? আমাদের আর সন্তান নাই। দেখ আমরা মুসলিম, আমরা আজ রোজা রেখেছি, আমার ভিটা ভূমির আলো জ্বলাবে আমার ছেলে। তোমরা নিয়ে যেও না, তোমাদের পায়ে ধরি। এক গোমটা পরা স্ত্রী তার মেহেদী রাঙ্গা হাত দেখিয়ে বলেছিল, জাত ভাই আমার গত এক মাস আগে আমার বিয়ে হয়েছে, আমি আমার স্বামীকে অনেক ভালবাসি, আমি এতিম, আমার বাবা-মা নাই, এলাকার মানুষ চাঁদা তুলে আমাকে বিয়ে দিয়েছে, আমার স্বামীকে নিয়ে যেও না। এক ডাক্তার এর সুন্দর পরিবারে ৪ ছেলেকে এক সাথে গুলি করেছিল। ৪ সন্তানের বাবা-মা খুব আবেগী মাখায় বলেছিল বাবা তোমরা আমাদের মেরে ফেল। আমাদের যাবার সময় হয়েছে, আমাদের বয়স হয়েছে। আমরা চলে গেলেও কোন সমস্যা হবে না। আমাদের ছেলেগুলোকে মেরো না। আমরা অনেক কষ্ট করে ওদের লেখাপড়া শিখিয়েছি। মানুষের মত মানুষ করেছি। বাড়ির উঠানে ওদের রক্তে দিয়ে ভরে দিয়েছিল। কারও কথা শুনে নি। বাকী মানুষগুলোকে একটা নির্দিষ্ট জায়গায় নিয়ে দাড় করিয়ে ওরা অনেক হৈ-হল্লুর ঐ সারল্যতা ভরা মানুষগুলির শব্দ বন্ধ করে দিয়েছে। রক্তের বন্যা বইয়ে দিয়েছে। পার্শ্বে ছিল একটা খাল। পুরো খালটি লাল রং ধারন করেছিল। বাড়ি বাড়ি মৃত লাশ-রক্ত দিয়ে শোকের শব্দ উপহার দিয়েছিল। যদিও একটি বইয়ের সাহায্যে ৮০ জনের একটি তালিকা জানতে পেরেছে নতুন প্রজন্ম। তবে গ্রামের মানুষগুলো তথ্য মতে প্রায় ১৫০জন এর বেশি মানুষ মত শহীদ হয়েছিল ঐ ছোট গ্রামটিতে।

সেই গল্প গুলোর বক্তা ছিল আমার প্রাণ প্রিয় দাদী। আমি এই গ্রামেরই সন্তান। সেই প্রাচীনকালের গল্প গুলো শুনতাম আমার দাদীর কাছ থেকে। তখন ছোট ছিলাম, গ্রামের বাড়িতে মস্ত বড় উঠানে চাঁদনী রাত্রে দাদীর কোলে মাথা রেখে শুনতাম। গল্প গুলো শুনার পর উপরের চাঁদটা কেন জানি আড়ালে চলে যেত, আলো দিতে চাইত না। হয়তো চাঁদও কষ্ট পেত। আমার ৪ দাদাকে মেরেছিল ঐ দিন। আমার বাবা নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে ভাগ্যগুনে বেঁচে গিয়েছিল। দাদী গল্পগুলো বলার সাথে সাথে শরীলে আমার কাঁপন ধরত। দাদীর চোখের অশ্রুগুলো আমার চোখে মুখে পরার পর আমার চোখের অশ্রুর সাথে মিশে যেত। আাঁকাশের দিকে চাঁদকে হাজার বার খুঁজলেও চাঁদ আর দেখা দিত না। চোখ দুটি বুজলে স্পষ্ট চিন্তা করতে পারতাম সেই দিনগুলি। দাদীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রাতে কোন এক সময় চোখের কোনায় পানি নিয়েই ঘুমিয়ে যেতাম। প্রায় সময় দাদীর মুখে ঐ হায়েনার মত হ্রিংস দিনটির গল্প শুনতাম। ঐ গ্রামের কেউ আবেগ ছাড়া মুক্তিযোদ্ধের ইতিহাস বলতে পারে না। একটু বলেই আবেগে চোখ দিয়ে পানি পড়ে। বলতে পারে না বাকি অংশটুকুই। মুক্তিযোদ্ধের চেতনাটা আমার রক্তে সেই সময় থেকেই ধারন করেছিল। এই লেখাটি লেখতে গিয়ে চোখের পানি আটকে রাখতে পারছি না।

একদিন হঠাৎ না বলে আমার প্রিয় দাদীও ছোট বেলায় কোন এক রাত্রে উপরে চলে গেল। ঐ দিন অনেক কেঁদেছিলাম। কেঁদেছিলাম দাদীকে শুধু হারানোর জন্য নয়। কেঁদেছিলাম স্বাধীনতার চেতনাকে জাগ্রত করার গল্প বলার মানুষটি যে হারিয়ে গেছে। জ্যোৎ¯œা রাতে চাঁদের আলোয় দাদীকে এখনও খুঁজি, প্রাণপ্রিয় দাদী আমাকে ঠিকই নিরাশ করে না। দাদীকে ঠিকই দেখতে পায়। তবে এবার দুটি চোখ বন্ধ করতে হয়। আজও চোখ বন্ধ করি। কিন্তু এখন বন্ধ করলে আর একটা কথা দাদীর মনে পড়ে, ওরা নাকি এমন হায়েনার মত ছিল যে, একটা যুবককেও রাখে নি লাশ গুলো কবর দেওয়া জন্য। একদিন-দুইদিন পর ৬০ বছর ৭০ বছরের বৃদ্ধ মানুষগুলি সন্তান ও নাতির লাশ গুলি চোখের পানি নিয়ে রোজা রেখে কাঁধে তুলে নিয়েছিল। রোজা রেখে জীবনের সর্বশেষ শক্তি দিয়ে ৮-১০জন করে করে এক একটি কবরে সমাধি দিয়েছিল। এই লাশগুলোর সাথে ঐ বৃদ্ধগুলিও চাচ্ছিল কবরে শুয়ে থাকতে। হয়তো ঐ বৃদ্ধগুলি শুনতে পেয়েছিল কবরে রাখা মৃত প্রিয়জনদের ডাকগুলি ….. ঐ বাবা, ঐ দাদা আমাদের একা রেখে যেও না। আমরা একা থাকতে পারব না।

লেখক
তারেক আজিজ
(শহীদদের গ্রাম), বিটঘর,
সরাইল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি
Designed By Linckon