২৬শে এপ্রিল, ২০১৮ ইং, বৃহস্পতিবার, ১৩ই বৈশাখ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এক ‘কফি বালকের গল্প’


প্রকাশিত :১৫.১২.২০১৭, ৭:১৮ পূর্বাহ্ণ

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এক ‘কফি বালকের গল্প’

তারেক আজিজ ॥ ব্রাহ্মণবাড়িয়া ॥
একটি ছোট বালক। ছোট মুখ। কফি ওয়ালা। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পরিচিত একটি মুখ। সারাক্ষণ হাসিখুশি থাকে। সারল্যতা ভরা মুখটা নিজে যেমন হাসে অন্যকেও কফি কফি ডাক দিয়ে হাসায়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া বিভিন্ন সিগন্যাল পয়েন্টে সারাদিন ঘুরে ঘুরে লাল রঙ্গের একটি ড্রেস পরে কপি বিক্রি করে। পথে ঘুমায়, পথে খায়, হয়তো কখনও কাজ করতে গিয়ে কারও ধিক্কার অথবা ঘৃণার শিকার হয়। ষ্টেশনে থাকিয়ে থাকে কখন ট্রেন আসবে, কখন উঠবে ট্রেনে, কখন বিক্রি করবে কফি। জীবিকা নির্বাহের জন্য দ্বারে দ্বারে ছুটে বেড়ায়। নাম তার রিপন মিয়া, বয়স আনুমানিক ১০ বছর। দুই বোন ও এক ভাই। সারাদিন কপি বিক্রি করার জন্য দুপুরে খাওয়া দাওয়া করে কোন রেলষ্টেশন অথবা বাস ষ্টেশনে। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে হয়তো অনেক সময় ডাষ্টবিন থেকে কুড়িয়ে পাওয়া খাবারই তার কপালে জুটে। বাবা অসুস্থ্য হওয়ায় সব সময় রিক্সা চালাতে পারে না। মধ্যে মধ্যে রিক্সা চালায়। মা গৃহিনী। হয়তো পরের বাড়িতে মধ্যে মধ্যে গিয়ে কিছু কাজকর্মও করে। ১০ বছরের রিপনই সবার বড়। সারাদিন কষ্ট করে ৮০০-৯০০টাকার কপি বিক্রি করার পর সে নাকি ১৫০-২০০ টাকা পায় মালিক পক্ষের কাছ থেকে। এটা দিয়েই তার সংসার চালায়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের বর্ডার বাজারে কোন এক ছোট বস্তিতে তার বসবাস। বৃষ্টির দিনে টাপুর টুপুর করে ভাঙ্গা ঘরে পড়ে বৃষ্টি। ছোট দুই বোনের সাথে হয়তো তখন বিভিন্ন বালতি-পাত্র নিয়ে দৌড়াদৌড়ি শুরু করে বৃষ্টির পানিকে নিরাপদে আশ্রয় দেওয়া জন্য। যেন বৃষ্টির পানিগুলো ঘরে না পরে, সেই ছোট বোনের সাথে রাখা থালা-বাসনগুলোতে পড়ে। আর এই শীতে ছোট এই ঘরটিতে কোন ছিড়া কাঁথা দিয়েই হয়তো বাবার সাথে ঘুমিয়ে পড়ে। দেখতে স্মার্ট হলেও খুব লক্ষ করলে দেখা যায় যে, তার চেহারায় একটা কেমন যেন অপূর্ণতার ভাব ফুটে উঠে। আমি ঐ সব শিশুদের মনের ভাষা বুজি, চোখের ভাষা বুজি। জাগো ফাউন্ডেশনের অঙ্গ সংগঠন ভলান্টিয়ার ফর বাংলাদেশ নামে একটি সংগঠনে যুক্ত হওয়াতে ভাল করেই বুজি তাদের কষ্টগুলো। সংগঠনে সারা বছর এই সব নির্যাতিন পথশিশুদের সাথেই সময় ব্যয় করি। শুনতে পায় তাদের হাজারো আলোর পিছনে অন্ধকারের গল্পগুলি। যে গল্পগুলির বেশির ভাগই চোখের অশ্রুজড়ানোর মত গল্প। হয়তো মানুষের যে ৫টি মৌলিক চাহিদা প্রয়োজন, সেই ৫টির মধ্যে একটিও সে ভাল করে পায় না। কফি খাওয়ার সাথে সাথে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার স্কুলে যেতে ইচ্ছে করে না? মধ্যে মধ্যে ওর কাছ থেকে কফি খাওয়ার সুবাদে ভাল সখ্যতা গড়ে উঠেছে। সোজা সাপটা উত্তর ভাই কেনো করবে না কন? কিন্তু কে পড়াইবো আমারে। আর সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত যা রুজি করি সব টাকা তো মালিক নিয়ে নেয়। জিজ্ঞেস করলাম কেনো? উত্তরে বলল: মালিক আমাকে এই কপির কেটলি, কপি, চিনি ও দুধ কিনে দিছে। তাই ওনি প্রায় সব টাকায় নিয়ে নেয়। আমি যতই রুজি করি হয়তো কোন দিন ১৫০টাকা অথবা কোন দিন ২০০ টাকা দেয়। তখন বললাম তুমি এইগুলো কিনতে পার না? আর এগুলো কত টাকা লাগে? ছোট মুখে সাথে সাথে দীর্ঘশ্বাসের সহিত উত্তর ৪০০০-৫০০০ হাজার টাকা কখনও একসাথে জমাতে পারব আমি? কখনই না! বাবা অসুস্থ্য হওয়ায় এতগুলো টাকা একসাথে জোগাড় করতে পারে না। সময় হয়ে যাচ্ছে এই কথা বলে, সে চলে যায়। কফি কফি ডাক দিয়ে সে চলে যায়। হয়তো আবার আসবে। হয়তো আবার দেখা হবে কোন এক মার্কেটে, অখবা এক বাসষ্টেশনে অথবা এক রেলষ্টেশনে। হঠাৎ দেখা হওয়ার পর যখন জিজ্ঞেস করব ভাল আছ কি না? হয়তো উত্তর মিলবে ভাল আছি ভাই। কিন্তু এই ভাল থাকার কথার মধ্যে ফুটে উঠবে ছোট দুটি বোনের ঠিকমত খাবার সংগ্রহ না করার অপূর্ণতা, হয়তো কোন স্কুলের সামনে থাকিয়ে থাকা স্কুলে যাওয়া বালকদের দেখে নিজে না পড়ার অপূর্ণতা, আবার হয়তো তার যে দীর্ঘশ্বাসের সহিত বড় চাহিদা, সেই কফি বিক্রির কেটলি ক্রয় করার মাত্র= ৫,০০০/- টাকা সংগ্রহ না করার অপূর্ণতা।



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি
Designed By Linckon