১২ই আগস্ট, ২০১৮ ইং, রবিবার, ২৮শে শ্রাবণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



যে গ্রামে “পুলিশ” একটি ভালবাসার নাম


প্রকাশিত :২৬.১১.২০১৭, ১১:০১ পূর্বাহ্ণ

যে গ্রামে “পুলিশ” একটি ভালবাসার নাম

বিটঘর! একটি গ্রামের নাম। শুধু কি একটি গ্রামের নাম? বরং এই গ্রামটি একটি কষ্টের নাম, একটি গণহত্যার নাম, একটি অবেহেলিত নাম, ৮০জন শহীদের গ্রামের নাম, চোখ দিয়ে বের হওয়া অশ্রুর নাম, মায়ের সামনে সন্তানের রক্ত বয়ে চলার নাম, মেহেদী রাঙ্গা বউগুলির চোখের সামনে স্বামীর মৃত্যু দেখার নাম। গ্রামটি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সরাইল থানার ০৫নং পানিশ্বর উত্তর ইউনিয়নে অবস্থিত। ছোট ছবির মত সুন্দর গ্রাম। যে গ্রামের ভিতর দিয়ে বয়ে চলা ছোট একটি খাল, যেটি জাফর খাল নাম হিসেবে পরিচিত। গ্রামে আছেন বিখ্যাত আল্লাহর ওলী “হযরত আয়ৎ উল্লাহ শাহ”। যেখানে প্রতি বছর নির্দিষ্ট একটি দিনে দেশ-বিদেশের মানুষের লাখ লাখ সমাগম ঘটে। গ্রামটির পার্শ্বে আছে মেঘনা নদী। সুখেই দিন কাটে ঐ গ্রামের সারল্যতা ভরা মানুষগুলোর। কিন্তু গ্রামটির ইতিহাস যে অনেক করুন। ছবির মত সুন্দর হলেও যখন আপনি গ্রামের ইতিহাস জানবেন চোখ দিয়ে পানি ঝরবে। শত ইচ্ছে চেষ্টা করেও পানি ধরে রাখতে পারবেন না।

২৯ই অক্টোবর ১৯৭১ সাল! রমজান মাস, মুসলিমদের জন্য অত্যান্ত পবিত্র মাস। ঐ দিকে বাংলাদেশে চলছে তুমুল যুদ্ধ। হঠাৎ ঐ দিন পাক হানাদার বাহিনীর আক্রমন। তুমুল বেগে হ্রিংস প্রাণী হায়েনার মত আক্রমন চালায় তারা গ্রামের যুবকগুলির উপর। নিমিশেই ৮০ জনকে হত্যা করে। কাউকে সরাসরি গুলি করে, আবার কাউকে চোখ বেঁধে। যেটাকে বলা হয় গনহত্যা। বর্বরোচিত গনহত্যা। কল্পনা করেন তো…. একই পরিবারের ৪ যুবক নিহিত, আপন ভাই। বাবা-মা তার ৪ ছেলের রক্ত বাড়ির উঠানের মধ্যে ভেসে যেতে দেখেছে। ৪ পুত্রের রক্ত দেখে কি ঐ মা-বাবা বাঁচার জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে জোড় হাত করেছিল? নিশ্চয় না! তারাও কিছুদিন পর পুত্র শোকে মরে গিয়েছিল। এই রকম লোহমর্ষক ঘটনার আর অনেক স্বাক্ষী এই গ্রাম। গ্রামের নিরীহ মানুষগুলির কষ্ট কারও নিকট বলে না।

কারন রাজনৈতিক লোকগুলো হয়তো বলে বেড়ায় নির্বাচনের আগে, “ভাইসব… আমি যদি নির্বাচিত হয় তাহলে এই বার প্রথম এসেছি, দ্বিতীয়বার যখন আসব তখন আমার প্রথম দায়িত্ব থাকবে, সেই ৭৩জন শহীদদের জন্য কিছু করা। কথা দিলাম, আমার কথার কোন এদিক সেদিক হবে না।” তবে সারল্যতা ভরা মানুষগুলি ভোট দিয়ে নির্বাচিত করে, কিন্তু ঐ রাজনৈতিক সাহেব আর দ্বিতীয়বার আসেনা ঐ গ্রামে। যখন বলা হয় যাবেন না স্যার ঐ ৭৩ শহীদদের গ্রামে……।

তখন রাজনৈতিক সাহেবের কূটনৈতিক উত্তর “আমি যাব কেন? ইশ্বর নিজেই থাকেন ঐ ভদ্র পল্লীতে, ইশ্বরই দেখবেন তাদের।” শেষ পর্যন্ত এই কষ্টের দিনগুলির কথা কানে যায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পুলিশের তুমুল জনপ্রিয় জনাব মোঃ মিজানুর রহমান স্যার এর নিকট। যিনি বর্তমানে পুলিশ সুপার থেকে পদন্নতি হয়ে বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি হয়েছেন। সাথে সাথে প্রিয় স্যার ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জনাব মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন কে গ্রাম পরিদর্শন করতে বলেন। শেষ পর্যন্ত কোন রাজনৈতিক লোক নয়…. যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ পুরো বাংলাদেশ পুলিশের কাছে পবিত্রতার মডেল, তারাই আসল। শুধু অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নয়… আরও এসেছিল সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার সরাইল সার্কেল এ নিয়োজিত জনাব মনিরুজ্জামান ফকির স্যার সহ সরাইল থানার অফিসার ইনচার্জও। গ্রামটির মানুষ প্রিয় পুলিশদের পেয়ে যেন আনন্দে আত্মহারা হয়েগিয়েছিল।

গ্রামের পক্ষ থেকে বিভিন্ন নেতাকর্মী, যুবকরা ফুল দিয়ে বরন করেছিল। গ্রামের সবার প্রিয় হয়ে উঠা পুলিশ ইউনিটের কাছে কথা বলেছিল ঐ দিন ভাগ্যক্রমে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁছে যাওয়া এক বৃদ্ধ। যাহার কথাগুলো সবার হৃদয় স্পর্শ করেছে। পরবর্তী সময়ের বক্তেব্যে গ্রমের বিভিন্ন নেতাকর্মীরা সেই ৮০টি রক্ত ঝড়া প্রাণের দিকগুলি তুলে ধরেন। পর্যায়ক্রমে উক্ত থানার অফিসার ইনচার্জ বক্তব্য দেন, তারপর স্পর্শকাতর বক্তব্য দেন সরাইল সার্কেলে নিযুক্ত হওয়া জনাব মনিরুজ্জামান ফকির। যিনি অল্প সময়ে বিভিন্ন আলোচিত হচ্ছেন ভাল কাজের জন্য। তারপর আসেন হুদয় অনুরাগী বক্তব্য নিয়ে যোগ্য পিতার যোগ্য সন্তান হিসেবে পরিচিত, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান জনাব মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন, সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা।

ওনার বক্তব্য কতটা হৃদয় অনুরাগী তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ঘুরলেই পাওয়া যাবে…… গ্রামের বিভিন্ন মানুষের ভিডিওর কল্যানে ভাইরাল হয়ে গেছে অশ্রু ঝড়া বক্তব্য। সবার একই কথা… অতিরিক্ত পুলিশ সুপার স্যার তো মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, ওনি বুজবে না কে বুজবে শহীদদের পরিবারের ব্যথা। তার পর ঐ গ্রামে অবহেলায় পরে থাকা একটি স্মৃতি সৌধ, নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া গণকবর পরিদর্শন করেন। অবশেষে ঐ গ্রামের একটি মাদ্রাসার ছাত্রদের সাথে শহীদদের স্মরণে একটি মিলাদ মাহফিলে যোগদান করেন। তবে সর্বশেষ কথা হল এই যে, গ্রামের মানুষ এখন আবারও নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে।

স্বপ্ন তো তারা দেখতেই পারে……….. ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ এখন একটি ভালবাসার নাম, শত যুবকের অভিভাবকের নাম, শান্তির নাম, নির্ভয়ে রাত্রে পথ চলার নাম, কৃষককে ডেকে এনে হঠাৎ গরু উপহার দিয়ে মুখে হাসি ফুটানোর নাম, এতিম হাবিবাকে বিয়ে দিয়ে পুরো বিশ্বকে জাগ্রত সৃষ্টিকরার নাম, ক্রন্দনরত মৌসুমিকে হাসি ফুটানোর নাম, অনাথ সরকারী শিশু পরিবারে হাসি এতিম শিশুদের হাসি ফুটানোর নাম, গণপরিবহন ব্যবস্থাকে প্রতিবন্ধীবান্ধবকরণ এর নাম, বন্যা দুর্গতদের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার নাম, পুরো শহড়ের সৌন্দর্যবর্ধন করার নাম। আবার শুরু হচ্ছে স্বপ্ন দেখার পালা, তবে এবার হবে….. কারন একটাই, সবচেয়ে ভরসার শব্দটা এখন জড়িয়ে আছে ———“পুলিশ”———–।



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি
Designed By Linckon