১৯শে ডিসেম্বর, ২০১৭ ইং, মঙ্গলবার, ৫ই পৌষ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ



ভাষণটি এখন একটি আন্তর্জাতিক দলিল – মুহম্মদ সবুর


প্রকাশিত :২০.১১.২০১৭, ৪:৪৯ অপরাহ্ণ

ভাষণটি এখন একটি আন্তর্জাতিক দলিল
– মুহম্মদ সবুর

১৯৪৭ সালে দেশ যখন ভাগ হল, তরুণ ছাত্রনেতা শেখ মুজিব উপলব্ধি করলেন, এক উপনিবেশ থেকে বাঙালি আরেক উপনিবেশের অধীন হল। কলকাতা ছেড়ে আসার আগে ঘরোয়া বৈঠকে সহকর্মী ছাত্রনেতা কয়েকজনকে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বলেন- আমরা শেষ হয়ে গেছি, নতুন করে সংগ্রাম শুরু করতে হবে। ঢাকার রাজনৈতিক পরিবেশ দেখে বুঝতে পেরেছি, বাঙালি জাতি শেষ হয়ে গেছে; সেদিনই শপথ নিলাম বাংলার মানুষকে মুক্ত করতে হবে।

তার কিছুদিন পরই তিনি দেখলেন বাঙালির ভাষা ও কৃষ্টির ওপর পাকিস্তানের নেতা জিন্নাহ্সহ শাসকগোষ্ঠীর আঘাত। তিনি থেমে থাকেননি। প্রতিবাদে গর্জে ওঠেন। ১৯৪৮ সালে গঠন করেন ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ। এই সংগঠনের নেতৃত্বেই সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে শুরু করেন আন্দোলন। তার মধ্যে বাঙালি জাতি হিসেবে বেঁচে থাকার প্রশ্নটি ছিল তীব্র। রাতের অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে আন্দোলন করতেন- কী কঠিন অবস্থা ছিল! জনগণের ঘোর কাটানো ছিল প্রধান দায়িত্ব। ছাত্র ও শিক্ষিত সমাজ আন্দোলনে শামিল হলেও জনগণ ছিল নির্জীব।

সেদিন অক্টোপাসের মতো চারদিক থেকে বাংলাকে এবং বাঙালিকে শেষ করার ষড়যন্ত্র চলছিল। ঠিক সে সময়, ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ শেখ মুজিব গ্রেফতার হলেন। তখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র। বাংলা ভাষা রক্ষার জন্য বঙ্গবন্ধু অন্যসব সহকর্মীসহ জেলে আটক থাকা অবস্থায় সংকল্পে আরও দৃঢ় হন- বাঙালি জাতিকে জাগিয়ে তুলতে হবে, নতুবা ব্রিটিশদের নির্মম শোষণ শেষে পাকিস্তানি প্রভুদের শাসন-শোষণে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে পড়বে। বাঙালি জাতি বলে কিছুই থাকবে না। যে জাতি কিছুদিন আগেই ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ বলে আন্দোলন করেছে, তাদের জাগিয়ে তুলতে হবে বাংলা ও বাঙালিকে রক্ষা করার জন্য। বঙ্গবন্ধুর জানা ছিল, সংস্কৃতির বাহন হিসেবে ভাষা হচ্ছে জাতির সামগ্রিক ঐতিহ্যের ধারক। কায়মনে বাঙালি হওয়ার জন্য শেখ মুজিব তার জীবন সাধনা ও সংগ্রাম শুরু করেন সেই ১৯৪৮ সালেই।

বঙ্গবন্ধু ষাটের দশকে বাঙালির মুক্তিসনদ হিসেবে আমাদের বাঁচার দাবি ছয় দফা শীর্ষক পুস্তিকা প্রকাশ করেন। এটি ছিল ষাট দশকের মাঝামাঝি থেকে বাঙালির অবশ্যপাঠ্য রাজনৈতিক দলিল, যে দলিলের ভিত্তিতে বাঙালি সত্তরের নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী করেছিল বঙ্গবন্ধু ও তার দলকে। বঙ্গবন্ধু ৬ দফার প্রচারণার জন্য ষাটের দশকে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন- নাম ‘নতুন দিন’। সম্পাদক ছিলেন নজরুল অনুরাগী এবং বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠজন সুফি জুলফিকার হায়দার। পত্রিকাটি অবশ্য দীর্ঘায়ু লাভ করেনি। বঙ্গবন্ধু কঁচি-কাচার আসর ও সুরল ভৌমিকের মাধ্যমে ভবিষ্যতের বাঙালি গড়ে তোলার নেপথ্যে বড় ভূমিকা রেখেছেন। ষাটের দশকে যারা কঁচি-কাচার আসর করতেন, তাদের অধিকাংশই মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন।
বঙ্গবন্ধুর ভাষণ, বক্তৃতায় কাব্যিকতার ছোঁয়া রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে ৭ মার্চের ভাষণের কথা বলা যায়। তবে কেবল ৭ মার্চের ভাষণ নয়, তার অতীতের অনেক ভাষণেও কাব্য, ভাষা, ছন্দ, মাত্রা ও অনুপ্রাসের অনুরণন রয়েছে। ১৯৭০ সালের ৭ জুন রেসকোর্স ময়দানের ভাষণের দিকে তাকালে তার কাব্যিক শক্তির প্রমাণ পাওয়া যায়। এ ভাষণ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। ছোট ছোট বাক্য। কিন্তু অর্থের দ্যোতনা অনেক বেশি। হুমকির ভাষা যখন, তখন আঞ্চলিক বা উপজাতিকে সামনে এনেছেন, যা শ্রোতা-উদ্দীপক বৈকি! ১৯৭০ সালের ৬ ডিসেম্বর বেতার-টিভিতে সাধারণ নির্বাচনের প্রাক্কালে বঙ্গবন্ধু দীর্ঘ ভাষণ দেন। সেখানেও তার ভাষার প্রয়োগ ও সৌকর্য উল্লেখ করার মতো। সাড়ে সাত কোটি নিপীড়িত মানুষের সঙ্গে সহজ সংযোগ সাধন করার ভাষাই তিনি ব্যবহার করেছেন ভাষণে, বলেছেন- ‘২৩টি বছরের অত্যাচার, অবিচার, শোষণ ও শাসনে বাংলার মানুষ আজ নিঃস্ব, সর্বহারা। ক্ষুধায় তাদের অন্ন নেই, পরনে নেই বস্ত্র, সংস্থান নেই বাসস্থানের। বাঙলার অতীত আজ সুপ্ত, বর্তমান অনিশ্চিত, ভবিষ্যত অন্ধকার। গড্ডালিকা প্রবাহে গা ঢেলে দিয়ে আজও যারা ঘুমিয়ে আছেন, তাদেরকে এবার ডাক দিয়ে কেবল বলে যেতে চাই, জাগো, বাঙালি জাগো। তোমাদের জাগরণেই এদেশের সাত কোটি মানুষের মুক্তি।’ এ ভাষণের প্রতিটি শব্দ ও বাক্য একসূত্রে গ্রথিত। অনুপ্রাস এসেছে। মানুষের মনে বিপ্লবী চেতনা জাগাতে সহজ সরল, ছোট ছোট বাক্য ব্যবহার করেছেন বঙ্গবন্ধু। প্রতিটি বাক্য নানা দ্যোতনা বহন করে। শ্রোতা তার বোধ দিয়ে উপলব্ধি করে নিতে পারেন। কবিতার অনুরণন এখানে সহজেই মেলে। জনগণের চাহিদা ও আকাক্সক্ষাকে তাদের ভেতরে জাগিয়ে তোলার সংঘবদ্ধ করার কাজটি এই ভাষণের মাধ্যমে তিনি করেছেন।

স্বাধিকার আদায়ে ১৯৭১ সালের জানুয়ারিতে দলীয় নেতা-কর্মীদের উদ্দেশ্যে যে ভাষণ দেন, তাতে আবেগপূর্ণ ভাষার আড়ালে প্রতিরোধী হবার, কঠিন সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হবার আহ্বান জানান। বলা চলে, ৭ মার্চ ভাষণের পটভূমি এই ভাষণে রয়েছে- ‘প্রয়োজনে বাঙালি আরও রক্ত দেবে, জীবন দেবে, কিন্তু স্বাধিকারের প্রশ্নে কোনো আপস করবে না। বাংলার মানুষ যাতে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার নিয়ে বাঁচতে পারে, বরকত-সালাম-রফিক- শফিকরা নিজেদের জীবন দিয়ে সেই পথ দেখিয়ে গেছেন। বাহান্ন সালে রক্তদানের পর বাষট্টি, ছেষট্টি, ঊনসত্তরে বারবার বাঙালিকে রক্ত দিতে হয়েছে। কিন্তু আজও সেই স্বাধিকার আদায় হয়নি। আজও আমাদের স্বাধিকারের দাবি বানচাল করে দেবার ষড়যন্ত্র চলছে। এই ষড়যন্ত্র প্রতিহত করার জন্য বাংলার ঘরে ঘরে প্রস্তুত হতে হবে। এবার চূড়ান্ত সংগ্রাম। আর এই সংগ্রামে আমরা গাজী হয়ে ফিরে আসতে চাই। চরম ত্যাগের এবং প্রস্তুতির বাণী নিয়ে আপনারা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ুন। বাংলার প্রতিটি ঘরকে স্বাধিকারের এক একটি দুর্গে পরিণত করে দেখিয়ে দিন- বাঙালিকে দাবিয়ে রাখার শক্তি পৃথিবীতে কারও নেই।’ এই দাবিয়ে রাখা বাক্য তো মার্চের ভাষণে ‘দাবায়ে রাখবার পারবা না’ হয়ে ওঠে। বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণের শেষে কবিতার অনুরণন মেলে। এই কবিতার অন্তর জুড়ে রয়েছে একটি দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ দিক-নির্দেশিকা। বললেন তিনি- ‘সামনে আমাদের কঠিন দিন। আমি হয়তো আপনাদের মাঝে নাও থাকতে পারি। মানুষকে মরতেই হয়। জানি না, আবার কবে আপনাদের সামনে এসে দাঁড়াতে পারব। তাই আজ আমি আপনাদের এবং বাঙলার সকল মানুষকে ডেকে বলছি, চরম ত্যাগের জন্য প্রস্তুত হন- বাংলার মানুষ যেন শোষিত না হয়। বঞ্চিত না হয়। বাঙালি যেন আর অপমান-লাঞ্ছিত না হয়। দেখবেন, শহীদের রক্ত যেন বৃথা না যায়, যতদিন বাংলার আকাশ-বাতাস, মাঠ-নদী থাকবে, ততদিন শহীদরা অমর হয়ে থাকবে। বীর শহীদদের অতৃপ্ত আত্মা আজ দুয়ারে দুয়ারে ফরিয়াদ করে ফিরছে: বাঙালি তোমরা কাপুরুষ হইয়ো না। চরম ত্যাগের বিনিময়ে হলেও স্বাধিকার আদায় করো, বাংলার মানুষের প্রতি আমার আহ্বান প্রস্তুত হোন।’
জাতির পিতার ৭ মার্চের ভাষণে বাঙালি জাতিসত্তার বিকাশ ও জাগরণের দরজা উন্মোচিত হয়েছিল। প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বাক্য মুক্তিকামী মানুষের ভেতর দ্রুত সংযোগ স্থাপনে সক্ষম হয়েছিল। ওয়ার্ল্ড ডকুমেন্টারি হেরিটেজ হিসেবে ৭ মার্চের ভাষণ স্বীকৃতি লাভ করায় আমরা গর্বিত।
মুহম্মদ সবুর : কবি ও কথাসাহিত্যিক

সৌজন্যেঃ Daily Jugantor



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি
Designed By Linckon