২১শে নভেম্বর, ২০১৭ ইং, মঙ্গলবার, ৭ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ
  • প্রচ্ছদ » রাজনীতি » আপনার জয়ে গণতন্ত্রের জয় জননেত্রী শেখ হাসিনা: ফজিলাতুন নেসা বাপ্পি



আপনার জয়ে গণতন্ত্রের জয় জননেত্রী শেখ হাসিনা: ফজিলাতুন নেসা বাপ্পি


প্রকাশিত :১১.০৬.২০১৭, ৬:৫৯ পূর্বাহ্ণ

আপনার জয়ে গণতন্ত্রের জয় জননেত্রী শেখ হাসিনা: ফজিলাতুন নেসা বাপ্পি।।

received_1354614141297819

আজ ১১জুন। গণতন্ত্রের মানসকন্যা শেখ হাসিনা নি:সঙ্গ কারাগারের দু:সহ যন্ত্রনাময় ৩৩১ দিন পর ২০০৮ সালের এইদিন জাতীয় সংসদ ভবনে স্থাপিত সাবজেল থেকে সবুজ মাঠ পেরিয়ে বাংলার গণমানুষের কাছে বীরদর্পে ফিরে এসেছিলেন। রচনা করেছিলেন গণতন্ত্র মুক্ত হওয়ার এক অনবদ্য কাব্য।

প্রিয় নেত্রী! ভুলিনি সেদিন, যেদিন ভোর থেকে আকাশ ছিলো ঘন কালো মেঘে ঢাকা, থেমে থেমে বৃষ্টি, আমি ১৬ জুলাই’ ২০০৭ সালের সেই কালো দিনটির কথা বলছি। এক এগারোর কুশীলব, গণতন্ত্রের শত্রুরা আপনাকে অন্যায়ভাবে বিনা ওয়ারেন্টে গ্রেফতার করেছিল। অতিভোরে সুধাসদনের বাড়ীতে ঢুকে কি নিষ্ঠুর আচরণ করেছিল আপনার সঙ্গে, আপনার অসুস্থ্য স্বামী প্রয়াত পরমানু বিজ্ঞানী ড. এম ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে, ঘুমন্ত ছিলেন আপনারা, ওরা সুধাসদন তছনছ করেছিল, অনেক মূল্যবান কাগজপত্র নিয়ে গিয়েছিল, তারপরও আপনি তাদের সাথে সংযত ও অতিথিপরায়ন আচরন করেছিলেন। আপনাকে গ্রেফতার করতে যাওয়া সদস্যদের কেউ কেউ সিএমএম কোর্টে আমাকে বলেছিল যে, আপনি ওদের চা-বিস্কুট দিয়ে আপ্যায়ন করেছেন। কিভাবে পারেন আপনি! বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেই হয়তো এটা সম্ভব।

প্রিয় নেত্রী! গ্রেফতারের পূর্ব মুহুর্তে আপনি জনগনের উদ্দেশ্যে ২২ লাইনের একটি পত্র লিখলেন। যার উল্লেখযোগ্য অংশ- “কখনও মনোবল হারাবেন না, অন্যায়ের প্রতিবাদ করবেন, যে যেভাবে আছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবেন, মাথা নত করবেন না, সত্যের জয় হবেই, আমি আপনাদের সঙ্গে আমৃত্যু থাকবো।” আপনি শেষ অংশে লিখলেন, “জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের বাংলা গড়বোই, দুখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাবোই”- আপনি যা বলেন তা করে দেখান- তার প্রমাণ মাত্র এক যুগ আগে যে বাংলাদেশে ছিল ক্ষুধা, দারিদ্র, নিপীড়ন, নির্যাতনের হাহাকার, মাত্র আট বছরে আপনি সেই বাংলাদেশকে ঘুরে দাঁড় করিয়েছেন। আপনার প্রাজ্ঞ নেতৃত্বে আজকের বাংলাদেশ বিশ্বের সুখী অর্থনীতির অন্যতম দেশ।

১৬ জুলাই, ওই ভোর বেলাতে আপনাকে অন্যায়ভাবে গ্রেফতার করে সিএমএম আদালতে নিয়ে যাওয়া হলো- আপনার গাড়িটি অনুসরণ করে আমার গাড়ীটি যাচ্ছিল, ছিদ্দিক বাজার এলাকায় আপনাকে বহন করা গাড়ী প্রবেশ করার পর হঠাৎ কয়েকজন পুলিশ আমার গাড়ীটি থামানোর নির্দেশ দেয়, আমি গাড়ী থেকে নেমে পড়ি এবং দৌড়ে দৌড়ে আপনার গাড়ীটি অনুসরণ করতে থাকি। আমার পরনে আইনজীবীর পোষাক ছিল। আপনাকে সিএমএম কোর্টের নতুন বিল্ডিং এর দোতলায় ওরা নিয়ে গেলো এবং আদালতে ঢোকার দরজা তালাবন্ধ করলো। কিভাবে যে আদালত কক্ষে প্রবেশ করেছিলাম। অনেক আইনজীবীদের সম্মিলিত প্রতিরোধের মুখে ওরা তালা খুলে দিতে বাধ্য হয়েছিল। আদালতের ভেতর প্রবেশ করে আপনাকে সাদা পোষাক পরিহিত অবস্থায় দেখি, ঐ মুহুর্তে আপনাকে ছাড়া আমি আর কিছুই দেখছিলাম না। প্রিয় নেত্রী! জুই আমার অত্যন্ত প্রিয় ফুল। আপনাকে আমার কাছে জুই ফুলের মতো লাগছিলো। কি অবিচল আপনি! আমার চোখে পানি পড়তে দেখে বললেন, “মন শক্ত করো, মনোবল রাখো, এটা গণতন্ত্রের লড়াই, কঠিন পথ পাড়ি দিতে হবে, আমি কোন অন্যায় করিনি, জয় জনগনেরই হবে।” ওই মুহুর্তেই অনুভব করেছিলাম, নেত্রী! আপনিই গণতন্ত্র, আপনার মুক্তিতে গণতন্ত্রের মুক্তি।

আইনের শাসনের কি নমুনা দেখলাম কোর্টে! সকাল সাতটায় কোর্ট বসল, একটা অসত্য, ভূয়া, বানোয়াট মামলা যার বর্ণনা শুনলে ছোট্ট শিশুও হাসবে। প্রথমে একটা ভূয়া চাঁদাবাজির মামলা! তিনকোটি টাকা নাকি একটা ছোট স্যুটকেসে ভরে গণভবনে দিয়ে গেছে! হায়রে মিথ্যাচার! ঐ অজ্ঞের দলের কি ধারনা নাই যে ৫০০ টাকার নোট তিন কোটি টাকার ওজন হয় ৬৯ কেজি। আর ঐ টাকা একটা ছোট্ট ব্রিফকেসে ভরে গণভবনের গেইট থেকে উনি হেঁটে হেঁটে ৬৯ কেজি ভেতরে নিয়ে গেলেন! কি কুৎসিত মিথ্যাচার! এই কল্প কাহিনীরও অনেক ইতিহাস আছে। কথিত বাদীদের ধরে নিয়ে চোখ বেঁধে নির্যাতন করে, অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে অত্যাচার করে, জোর করে বাধ্য করে মিথ্যা মামলা দায়ের করতে।

আদালতের স্বাভাবিক আইনানুগ কোন কার্যক্রম সেদিন আমরা দেখি নাই, দেখেছি দম্ভ আর গণতন্ত্রকে হত্যা করার মানসিকতা। আদালতে প্রদত্ত আপনার নির্ভীক ও যুক্তিসংগত বক্তব্য সেদিন বিচারকের গোচরীভূত হয়েছিল কিনা জানিনা। আদালত কক্ষে প্রায় পুরোটা সময় আপনাকে ধরে আপনার পাশেই দাঁড়িয়েছিলাম নেত্রী। পুরো আদালত কক্ষ আইনজীবীতে কানায় কানায় পূর্ণ ছিল। আপনার দৃঢ়তা, প্রজ্ঞা, নির্ভীকতা আমাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। আদালতের তথাকথিত ফরমায়েসী কার্যক্রম শেষে আপনাকে যখন ওদের গাড়িতে করে আদালত থেকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল- মনে পড়ে, এখনো মনে পড়ে নেত্রী, মনে হচ্ছিল আমাদের আত্মাকে ওরা বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে! মতিয়া আপা, দিপু আপা, সাহারা আপা আপনাকে ধরে রেখেছিলেন, আপনার হাতে থাকা প্লাস্টিকের ঐ পানির বোতলের কথা আমি কোনদিন ভুলতে পারবোনা নেত্রী! আপনাকে যখন ওরা গাড়ীতে তুলতে যাচ্ছিল তখন রিয়াজ নামের ছাত্রলীগের এক কর্মী কি বিষন্ন দৃষ্টিতে আপনার দিকে তাকিয়েছিলো। ওরা যেভাবে আপনাকে টানা হ্যাঁচড়া করেছিলো, মনে হলে খুব কষ্ট পাই। ঐসময় কথা বলার শক্তি মনে হয় হারিয়ে ফেলেছিলাম, ঠিক যেমন মাঝে মাঝে ঘুমের মধ্যে কথা বলতে চাই, পারিনা, বুকে ব্যথা হয় ওইরকম। হঠাৎ আপনার সেই কথাটি মনে পড়লো যা আপনি আদালতের ভেতর আমাকে বলেছিলেন, ‘জয় জনগনেরই হবে।’ শক্তি পেলাম। ‘জয় বাংলা’ বলে শ্লোগান দিলাম। ওদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ছাত্র, জনতা, কৃষক, শ্রমিক, নারী-পুরুষ এই অন্যায়ের প্রতিবাদে রাজপথে গর্জে উঠলো। ওদের সকল ষড়যন্ত্র রুখে দিয়েছিলো আওয়ামী লীগের ত্যাগী নেতা কর্মীরা।

প্রিয় নেত্রী! এই ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি এক এগারোর কালো দিনগুলিতে আমাদের আইনী লড়াই ও রাজপথের লড়াইয়ে শক্তি ও সাহস যুগিয়েছিল, শুধুমাত্র ঢাকায় মহানগর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মাত্র ১৫ দিনে ২৫লক্ষ মানুষ আপনার মুক্তি চেয়ে গণস্বাক্ষর করেছিল। বিশেষ কারাগার ও বিশেষ আদালতের নিষ্ঠুর দিনগুলি আমাদের বেদনাহত করে, ওদের রক্তচক্ষু আমরা উপেক্ষা করেই আদালতে যেতাম।

FB_IMG_1497141772978

শোয়ার জন্য ওরা আপনাকে ভাঙ্গা খাট, ইঁদুরে কাটা লেপ-তোষক, চাদর দেয়। প্রথম রাতে খাট ভেঙ্গে গেলে আপনি সোফায় কোনরকম রাত কাটান। পরদিন ইট এনে ঐ ভাঙ্গা খাটের নীচে লাগানো হলো। ওদের এতো প্রতিহিংসা কেনো ছিলো? আপনার খাবার আসতো জেলখানা থেকে, দুপুড় গড়িয়ে বিকেল হয়ে যেতো খাবার আসতে! এইসব নিষ্ঠুর আচরন কাদের স্বার্থে করা হয়েছিল?

২১ আগস্ট ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা করে বিএনপি আপনাকে হত্যা করতে চেয়েছিল। আল্লাহর রহমতে আপনি বেঁচে যান কিন্তু আপনার কান ক্ষতিগ্রস্থ হয়, এক এগারোর কুশীলবরা আপনার চোখ ও কানের চিকিৎসা নিয়ে কতো নিষ্ঠুর খেলা খেলেছে। কিভাবে দিনের পর দিন অসুস্থ্য আপনাকে বিশেষ আদালতে হাজির করে হেনস্তা করেছে। সেইসব আমি নিজ চোখে দেখেছি। মিথ্যা মামলা দিয়ে ওরা ভেবেছিল আপনাকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করবে, দেশের সম্পদ লুণ্ঠন করবে, জনগণকে শোষণ করবে।

ওরা ভুলে গিয়েছিল- আপনি গণতন্ত্রের মানসকন্যা, হিমালয়ের মতো অবিচল, দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর ব্রত নিয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে নিরলস কাজ করছেন।

FB_IMG_1497141751345ওরা ভুলে গিয়েছিল- আপনি জনগনের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে, জেল, জুলুম, হুলিয়া, গ্রেনেড, বোমা, গুলি উপেক্ষা করতে জানেন।

বিশেষ আদালতে আপনাকে অবিচল দেখেছি। জনগণের মঙ্গল চিন্তায় নিজেকে ব্যস্ত রাখতেন আপনি। মাঝে মাঝে নিজেই শুনানীতে অংশগ্রহণ করতেন।

এর আগে গ্রেফতারের পূর্বে আপনি অসুস্থ্য কন্যাকে দেখতে বিদেশ গিয়েছিলেন। ওরা ১৮ এপ্রিল প্রেসনোট জারী করে আপনার দেশে ফেরার উপর নিষেধাজ্ঞা জারী করলো। বলা হলো, দেশে ফিরলে আপনাকে গ্রেফতার করা হবে নতুবা গুলি করে হত্যা করা হবে। আপনি সাহসী যোদ্ধা, প্রেসনোট, হুলিয়া, হুমকি এসবের তোয়াক্কা না করে দেশে ফিরলেন। লক্ষ লক্ষ জনতা আপনাকে বিমান বন্দরে, রাস্তায়, সুধাসদনে স্বাগত জানায়, জয় বাংলা ধ্বনিতে বাংলার আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হয়। আমার মনে পড়ে, ৭মে আপনার আগমনে ঐ বিকেলের সোনা রোদ আরো সোনালী হয়েছিল। জনতার উচ্ছাসে ভেসে গিয়েছিল নিষেধাজ্ঞা।

FB_IMG_1497141765775একবছরের আইনী লড়াই ও রাজপথের লড়াইয়ে বিজয়ী হয়ে আপনি গণতন্ত্রের প্রতীক হয়ে মুক্ত হয়েছিলেন ১১জুন, এটি আমার জীবনের সুখময় দিনের একটি। সংসদ ভবনে স্থাপিত বিশেষ আদালত থেকে সুধাসদনে যাওয়ার পথে পথে জনগণ আপনার প্রতি পুষ্প বৃষ্টি বর্ষণ করেছিল আর প্রতিটি নি:শ্বাসে আপনার জন্য শুভ কামনা করেছিলো। এই দৃশ্য যে দেখেছে কেবল সেই অনুভব করতে পারবে! বিশেষ কারাগারে থাকাকালীন আপনি সেখানকার দায়িত্বে নিয়োজিত অনেকের পারিবারিক, ব্যক্তিগত সমস্যার সমাধান করেছেন, ওদের মধ্যে কাউকে শিক্ষার পাঠও দিয়েছেন। যত্ন করে খাবার দিয়েছেন কাঠবেড়ালী, বেড়াল কে।

আপনি পেরেছেন নেত্রী! ঐ হিংস্র হায়েনাদের সকল ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে অবরুদ্ধ গণতন্ত্রকে মুক্ত করেছেন। আপনার প্রাজ্ঞ নেতৃত্বে বাংলাদেশ বিশ্বসভায় মাথা উচুঁ করে থাকা উন্নয়ন বিস্ময়। জনগণের প্রতি অপার বিশ্বাস আপনার শক্তি।

“আপনি চিরমনোরম

চির মধুর

বুকে নিরবধি

বহে শত নদী।”

আপনার জন্য অসীম ভালোবাসা।

FB_IMG_1497141812055

লেখকঃ

সংসদ সদস্য, অ্যাডভোকেট বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি
Designed By Linckon