২০শে নভেম্বর, ২০১৭ ইং, সোমবার, ৬ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ
  • প্রচ্ছদ » রাজনীতি » গণহত্যা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতকারীদের বিরুদ্ধে আইন প্রণয়নের প্রাসঙ্গিকতা



গণহত্যা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতকারীদের বিরুদ্ধে আইন প্রণয়নের প্রাসঙ্গিকতা


প্রকাশিত :০৯.০৫.২০১৭, ৫:৩৩ অপরাহ্ণ

গণহত্যা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতকারীদের বিরুদ্ধে আইন প্রণয়নের প্রাসঙ্গিকতা

FB_IMG_1494329366504
এডভোকেট ফজিলাতুন নেসা বাপ্পি এমপি : আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অনেক ব্যথা, বেদনা, সংগ্রাম ও গৌরবের ইতিহাস, অশ্রু ও রক্তের ইতিহাস। মহান ত্যাগ ও মহৎ অর্জনের ইতিহাস। কোনো ব্যক্তির এক হুইসেল নয়, এটি ১৯৪৯ সালের স্বাধিকার আন্দোলন, ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৬২’র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬’র ছয় দফা, ৬৯’র উত্তাল গণঅভ্যুত্থান, ৭০’র নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়ে বঙ্গবন্ধুর অনবদ্য নেতৃত্বের উপাখ্যান। ’৭১-এর ২৫ মার্চ কালরাতে বাংলার মাটিতে ভয়াবহ ও নৃশংস গণহত্যাটি শুরু করে বর্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী, তাদের দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশামস, মুজাহিদ বাহিনী। ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে ওরা বাঙালি জাতিসত্তাকে হত্যার নিষ্ঠুর যজ্ঞে মেতে উঠেছিল। হায়েনার দল ২৫ মার্চ রাতে অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে ঘুমন্ত নিরস্ত্র বাঙালির ওপর- রাজধানী ঢাকায় প্রথম হামলা করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র, শিক্ষক ও কর্মচারীদের ওপর, পুলিশ ও ইপিআরের সদর দফতরে। আগুন ধরিয়ে দেয় বাজার ও বস্তিতে। আতঙ্কে হাজার হাজার নারী, পুরুষ, শিশু ঘর থেকে বের হলে তাদের ওপর মেশিনগানের গুলিবর্ষণ করে একটানা, যতক্ষণ না প্রত্যেক মানুষ মারা না যায়। বাংলার মাটি, বাংলার প্রাণ সেদিন ভেসে গিয়েছিল রক্তগঙ্গায়। ওই রাতেই ওরা গ্রেফতার করে স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে, তছনছ করে বঙ্গবন্ধুর ধানমণ্ডির ঐতিহাসিক ৩২ নম্বরের বাড়ি। গ্রেফতারের আগে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন-

‘This may be my last message from today Bangladesh is independent. I call upon the people of Bangladesh wherever you might be and with you have, to resist the army of occupation to the last. Your fight must go on until the last soldier of the Pakistan occupation army is expelled from the soil of Bangladesh and final victory is achieved.’

এ প্রসঙ্গে সিদ্দিক সালিকের ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ বই থেকে অনূদিত একটি উদ্ধৃতি উল্লেখ করতে চাই : ‘দোজখের দরজাগুলো একবারেই খুলে দেয়া হল। যখন বন্দুকের প্রথম গুলিটি ছোড়া হল, শেখ মুজিবুর রহমানের কণ্ঠস্বর পাকিস্তানের সরকারি রেডিওর কাছাকাছি তরঙ্গ-দৈর্ঘ্যে ভেসে এলো। এটা নিশ্চয় যা হবে এবং সেমত জানান দিল, শেখ সাহেব পূর্ব পাকিস্তানকে ঘোষণা করেছেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ হিসেবে’ (পৃষ্ঠা ৭৫)।

’৭১-এর ২৯ মার্চ সিডনির মর্নিং হেরাল্ড লিখেছে, ‘ঢাকার মাটিতে ২৫ মার্চ রাতেই পাকিস্তান বাহিনী ১ লাখ বাঙালিকে হত্যা করেছে।’ মাত্র ৯ মাসে ৫৬ হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশে ৩০ লাখ মানুষকে হত্যা করা হয়। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাদের দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশামস প্রতিদিন গড়ে ৯ থেকে ১২ হাজার মানুষকে হত্যা করেছে। ২০ মে ’৭১, চুকনগরে একদিনে হত্যা করা হয় ১০ হাজার মানুষ। ’৮১ সালের ডিসেম্বরে সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার ৩৩তম বার্ষিকী উপলক্ষে জাতিসংঘ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়- বিশ্বের ইতিহাসে যেসব গণহত্যার ঘটনা ঘটেছে, তার মধ্যে স্বল্পতম সময়ে সর্বাধিকসংখ্যক ব্যক্তি নিহত হয়েছে বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের গণহত্যায়। বলা হয়েছে, ‘This is the highest daily average in the history of Genocides.’

আর্মেনিয়াতে গণহত্যা হয়েছে ৬ বছরে ১৫ লাখ, ভিয়েতনামে ২০ বছরে ৩৬ লাখ আর বাংলাদেশে মাত্র ৯ মাসে ৩০ লাখ মানুষকে হত্যা করা হয়। ’৭১-এর অক্টোবরে সিআইএ মার্কিন সিনেটকে অবহিত করেছিল ‘ইতিমধ্যে পশ্চিম পাকিস্তানিরা পূর্ব পাকিস্তানে ২৫ লাখ বাঙালিকে হত্যা করেছে।’ মার্কিন সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি ভারতের শরণার্থী শিবিরগুলো পরিদর্শন করেন ’৭১ সালে। তিনি পাকিস্তানি সৈন্যদের বিরুদ্ধে সরাসরি গণহত্যার অভিযোগ আনয়ন করেন। ‘গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ডস রেকর্ডসে’ এ গণহত্যাকে বিশ শতকের ৫টি ভয়ঙ্কর গণহত্যার অন্যতম বলে উল্লেখ করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘নিরাপত্তাবিষয়ক আর্কাইভের’ অবমুক্তকরণ দলিলে এ নৃশংস হত্যাযজ্ঞকে ‘Selective genocide’ বা ‘Genocide’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। স্যামুয়েল টটেন সম্পাদিত ‘সেঞ্চুরি অব জেনোসাইড’ গ্রন্থে বাংলাদেশের গণহত্যায় নিহতের সংখ্যা ৩০ লাখ বলা হয়েছে। এনসাইক্লোপেডিয়া আমেরিকানা, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকেও ৩০ লাখ বলা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় টাইম ম্যাগাজিন মন্তব্য করেছিল, ‘It is the most incredible, calculated thing since the days of the Nayis in Poland.’ সে সময় ঢাকায় অবস্থানরত ব্রিটিশ সাংবাদিক সাইমন ড্রিং বলেছেন, ‘২৫ মার্চ গণহত্যার যে চিত্র আমি ঢাকায় প্রত্যক্ষ করেছি এবং পরবর্তী ৯ মাসে সমগ্র বাংলাদেশে যা অব্যাহত ছিল তার ভিত্তিতে ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা ৩০ লাখ হতে পারে।’

১৩ জুন ’৭১-এ এই নিষ্ঠুর গণহত্যা নিয়ে পাকিস্তানি সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের একটি প্রত্যক্ষদর্শী প্রতিবেদন বিশ্ব বিবেককে নাড়িয়ে দেয়, যা লন্ডনের ‘সানডে টাইমস’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। এ গণহত্যা বন্ধ করার লক্ষ্যে জর্জ হ্যারিসন ও পণ্ডিত রবিশংকর ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ আয়োজন করেন। জর্জ হ্যারিসনের ‘বাংলাদেশ বাংলাদেশ’ ধ্বনি এখনও আমাদের শিহরণ জাগায়। শাহরিয়ার কবিরের ডকুমেন্টারি ‘জার্নি টু জাস্টিসে’ বিশ্বের খ্যাতনামা গণহত্যা বিশেষজ্ঞ ও আইন প্রণেতারা এ গণহত্যা সম্পর্কে মর্মস্পর্শী ও হৃদয়বিদারক বর্ণনা দিয়েছেন, যা দেখলে হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটে। তাদের মধ্যে উইলিয়াম স্লোগান, গিতা সেগাল, ফেডরিখ মাল্ম, বিধুকুমারী দেবী ও আরও অনেকে রয়েছেন। এমনকি খোদ পাকিস্তানের সীমা কার্মানি, সৈয়দ হায়দার ফারুখ মাহমুদি (জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা মউদুুদির পুত্র), আহমদ সালিম, তাহিরা আবদুল্লাহ এ নৃশংস গণহত্যার নিন্দা জানিয়েছেন, বিচার চেয়েছেন। এটি ছিল পরিকল্পিত গণহত্যা। পাকিস্তানি জেনারেল রাও ফরমান আলী তার ডায়েরিতে লিখেছিল, ‘Paint the green of East Pakistan Red.’ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান বলেছিল, ‘Kill three million of them and the rest will eat out of our hands.’

মহান মুক্তিযুদ্ধে বর্বর পাকিস্তানিদের নিষ্ঠুরতার চিত্র বিশ্বের প্রায় সব গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। ৫ এপ্রিল ১৯৭১-এ নিউজ উইকে প্রকাশিত একটি সংবাদে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ও বাংলার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বক্তব্য ছাপা হয়েছিল। ‘শেখ মুজিব ও তার দল পাকিস্তানের শত্রু, বিনা শাস্তিতে এদের রেহাই দেয়া হবে না’- প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল, তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে। শেষ শত্রু সৈন্য নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত যে কোনো মূল্যে শত্রুদের মোকাবেলা করো এবং পশ্চিম পাকিস্তানিদের নিষ্ঠুর স্বৈরশাসনের কবল থেকে দেশকে বাঁচাও’- শেখ মুজিবুর রহমান। (সূত্র : বাংলাদেশ জেনোসাইড অ্যান্ড ওয়ার্ল্ড প্রেস, মূল সংগ্রহ ও সম্পাদনা : ফজলুল কাদের কাদেরী, বাংলা অনুবাদ সম্পাদনা : দাউদ হোসেন, পৃষ্ঠা : ৩৪)।

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধটি বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে জনযুদ্ধে পরিণত হয়েছিল, প্রত্যেকেই যার যার অবস্থান থেকে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। অস্ত্র হাতে বীর বাঙালি সেদিন পরাজিত করেছিল বর্বর পাকিস্তানিদের, ওরা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস ভুট্টো-ইয়াহিয়া বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের মিয়ানওয়াল কারাগারে অন্ধকার প্রকোষ্ঠে রেখেছিল। কারাগারের ভেতর কবর খুঁড়েছিল বঙ্গবন্ধুর জন্য। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘যে মানুষ মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত, কেউ তাকে মারতে পারে না।’ মৃত্যুর মুখে এমন প্রত্যয় যিনি ব্যক্ত করতে পারেন তিনি আমাদের জাতির পিতা, বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতা এনে দেয়ার জন্য তিনি তার জীবনের ৪ হাজার ৬৮২ দিন কারাভোগ করেছিলেন।

’৭২-এর ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। ওইদিন তিনি এক বক্তব্যে বলেন- ‘বাংলার মাটিতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে।’ এ লক্ষ্যে ’৭২-এর ২৪ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু সরকার প্রণয়ন করে ‘The Bangladesh Collaborators (Special Tribunals) Order, 1972’, যা দালাল আইন নামে পরিচিত। ’৭৩-এর জুলাইয়ে প্রণয়ন করা হয় International Crimes Tribunals Act- 1973. সারা দেশে ৭৩টি ট্রাইব্যুনাল গঠন করে যুদ্ধাপরাধের দায়ে প্রায় ১১ হাজার দালালের বিচার চলছিল। এর মধ্যে ৭৫২ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ডিত করা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের সংবিধানে ১২, ৩৮, ৬৬ ও ১২২ নং অনুচ্ছেদ সংযোজন করে দালালদের রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছিলেন, ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছিলেন। দালালদের ভোটাধিকার ও সংসদ সদস্য হওয়ার অধিকার ছিল না।

’৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে বাংলাদেশকে আবারও পাকিস্তান বানানোর লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করা হয়। জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ইনডেমনিটি দেন, বিদেশি দূতাবাসে চাকরি দেন, পুনর্বাসন করেন। ’৭৫-এর ৩১ ডিসেম্বর দালাল আইন বাতিল করে অর্ডিন্যান্স নম্বর-৬৩/১৯৭৫ জারি করেন, এবং কারাগারে আটক ও দণ্ডিত সব যুদ্ধাপরাধীকে ছেড়ে দেন। ’৭৬ সালে সেকেন্ড প্রক্লেমেশন অর্ডার নম্বর-৩/১৯৭৬ জারি করে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করার লক্ষ্যে সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদের শর্তাবলী তুলে দেন। সেকেন্ড প্রক্লেমেশন ঘোষণা জারি করে সংবিধানের ১২২ অনুচ্ছেদ তুলে দিয়ে দালালদের ভোটার হওয়ার সুযোগ দেন। প্রক্লেমেশন অর্ডার নম্বর-১/১৯৭৭ জারি করে দালালদের সংসদে নির্বাচিত হওয়ার লক্ষ্যে সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদের কিছু অংশ তুলে দেন। প্রক্লেমেশন অর্ডার নম্বর-১/১৯৭৭-এর মাধ্যমে সংবিধানের ১২নং অনুচ্ছেদ তুলে দিয়ে দালালদের রাজনীতি করার সুযোগ দেন।

তিনি স্বাধীনতাবিরোধী শাহ আজিজকে প্রধানমন্ত্রী, রাজাকার আলীমকে মন্ত্রী বানান। বঙ্গবন্ধু ’৭৩ সালের ১৮ এপ্রিল গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযম গংয়ের নাগরিকত্ব বাতিল করেছিলেন। জিয়াউর রহমান ’৭৮ সালে গোলাম আযমকে দেশে ফিরিয়ে আনেন। জিয়াউর রহমানের সময় সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর মুক্তিযোদ্ধা অফিসার ও সৈনিকদের বেছে বেছে হত্যা করা হয়।

সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধে জাতির পিতার নেতৃত্বের ইতিহাস নিষিদ্ধ করে রেখেছিলেন। নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস জানতে দেয়া হয়নি। এরই ধারাবাহিকতায় ’৯১ সালে খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এসে দেশের ইতিহাসকে ভিন্নপথে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেন। সংবিধানবহির্ভূতভাবে ক্ষমতা দখলকারী জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক বানানোর চেষ্টা চালায় বিএনপি। রাজাকারের গাড়িতে জাতীয় পতাকা তুলে দেয়া হয়, আর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবি করায় শহীদ জননী জাহানারা ইমামের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ দলিলপত্র ১৫ খণ্ডের সিরিজ গ্রন্থের ২০০৪ সালের পুনর্মুদ্রণকৃত তৃতীয় খণ্ডের প্রথম পৃষ্ঠা থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ২৬ মার্চের ‘ডিক্লারেশন অব ইনডিপেনডেন্স’ বা ‘স্বাধীনতার ঘোষণা’ বাদ দিয়ে জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক বানানোর চক্রান্ত করে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার।

বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা বাঙালি জাতির আলোকবর্তিকা, যিনি নিকষ কালো অন্ধকার দূর করেছেন, তার নেতৃত্বে আমরা উদয়ের পথে যাত্রা করছি। তিনি জীবনের ওপর মারাত্মক ঝুঁকি নিয়ে সব অপশক্তি ও নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে জাতির পিতার অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করছেন দৃঢ় প্রত্যয়ে। কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযম গংয়ের বিচার চেয়ে ১৯৯২ সালের ১৬ এপ্রিল জাতীয় সংসদে দেয়া তার একটি বক্তব্য এখানে উল্লেখ করছি, ‘এই সংসদ সার্বভৌম সংসদ। সেই লক্ষ্যে, আমি বিশ্বাস করি যে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধাচরণ, যুদ্ধ ও গণহত্যাসহ মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ সাধন, বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠার পরও পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধারের সঙ্গে জড়িত থেকে বাংলাদেশের বিরোধিতা, বিদেশি নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও ষড়যন্ত্রমূলকভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের উদ্দেশ্যে বেআইনি রাজনৈতিক তৎপরতায় লিপ্ত পাকিস্তানি নাগরিক গোলাম আযমের বিরুদ্ধে ১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ জনগণের যে মতামত প্রতিফলিত হয়েছে, তাকে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ আন্তর্জাতিক ক্রাইম অ্যাক্ট ১৯৭৩ অনুসারে ট্রাইব্যুনাল গঠন করে, তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো সম্পর্কে বিচারের জন্য আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য আপনার মাধ্যমে এ সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। সেই লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে গোলাম আযম ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে প্রসিকিউশন ও বিচারের ব্যবস্থা করার প্রস্তাব রাখছি।’

বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা তার নির্বাচনী ইশতেহারে দেয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ২০১০ সালের ২৫ মার্চ গঠন করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এ ট্রাইব্যুনালে যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যার বিচার চলছে। রায় কার্যকর হচ্ছে। ট্রাইব্যুনাল বন্ধ করে দিতে, বিতর্কিত করতে দেশে-বিদেশে গভীর ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত করছে যুদ্ধাপরাধীর দল। এমনকি ট্রাইব্যুনাল থেকে নথি চুরি করেছে। যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে ডলারের বিনিময়ে লবিস্ট নিয়োগ করা হয়েছে। এদের মধ্যে টবি ক্যাডম্যান আর একিন গাম্পের কথা উল্লেখ করতে পারি। ওই ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউর হিসেবে আমার কাজ করার সুযোগ ঘটেছিল- ওই দুষ্ট চক্রের থাবা যে কত ভয়ঙ্কর সেটি তখন প্রত্যক্ষ করেছিলাম।

যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির রায় কার্যকর হলে ওই দলের নেত্রী পাকিস্তানের মতোই মর্মাহত হন। ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে বিএনপি-জামায়াত একত্রে হরতাল করে। ২০১১ সালে প্রকাশ্য জনসভায় বিএনপি নেত্রী গোলাম আযম, নিজামী, সাঈদী, সাকা চৌ গংদের মুক্তি দাবি করেছিলেন।

খালেদা জিয়া ও বিএনপি নেতারা পাকিস্তানের সুরে মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্কিত বক্তব্য দেন। ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তে ভেজা বাংলার মাটিতে এ ঔদ্ধত্য ও স্পর্ধা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। আমরা মেনে নিতে পারি না। এটি গর্হিত অপরাধ। ইতিমধ্যে মহান জাতীয় সংসদ ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস হিসেবে পালনের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।

এখন প্রয়োজন গণহত্যা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতকারীদের শাস্তির জন্য আইন প্রণয়ন। পৃথিবীর ১৭টি দেশে গণহত্যা অস্বীকার বা Holocaust denial law রয়েছে। যেমন : অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, চেক রিপাবলিক, ফ্রান্স, জার্মানি, হাঙ্গেরি, নেদারল্যান্ডস, পোল্যান্ড, পর্তুগাল, রাশিয়া, রোমানিয়া ইত্যাদি।

বীরের রক্তস্রোত, মায়ের অশ্রুধারা আমরা ব্যর্থ হতে দেব না। ত্রিশ লাখ শহীদ বুকের রক্ত দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনা করে গেছেন। দুই লাখ সম্ভ্রম হারা মা-বোনের আর্তনাদ আমরা ভুলিনি।

রাজনীতির কবির অমর কবিতা, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ আমাদের অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ, আত্মায় বিরাজমান। এ প্রসঙ্গে ৮ মার্চ, ১৯৭১ দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের অংশ ছিল ঠিক এরকম : ‘‘আবহমান বাংলার বাসন্তী সূর্য আর উদার আকাশকে সাক্ষী রাখিয়া গতকাল নির্ভীক নেতা এবং বীর জনতার কণ্ঠস্বর একই সুরে ধ্বনিত হইয়া ওঠে যুগ-যুগান্তর, দেশ-দেশান্তরের সকল মুক্তি-পিপাসু সভ্য জাতির হৃদয়বাসনার অমোঘ মন্ত্র ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম।’ ধ্বনি ওঠে লাখ লাখ কণ্ঠে দিগন্ত কাঁপাইয়া, ‘জয় বাংলা’ ৭ই মার্চ তাই বাংলার সার্বিক স্বাধিকার আন্দোলনের দুর্গম দুস্তর পথের প্রান্তে একটি অতুলনীয় স্মৃতিফলক।’’

যারা গণহত্যা অস্বীকার করে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করে- তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বে বিশ্বাস করে না। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ, ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণায় বিশ্বাস করে না। ১০ এপ্রিলে প্রণীত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র মানে না। যারা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করে, তারা মুজিবনগরে গঠিত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার মানে না, যে সরকারের অধীনে আমরা সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম। ওরা আমাদের সংবিধান মানে না, জাতীয় পতাকা, জাতীয় সঙ্গীতকে অবমাননা করে। তাই ওদের শাস্তির জন্য আইন প্রণয়ন আবশ্যক। গত ০৪ মে, ২০১৭-এ এসংক্রান্ত আমার একটি সিদ্ধান্ত প্রস্তাব মহান জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়।

বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে অনেক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। আমি বিশ্বাস করি ’৭১ সালে বর্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী, তাদের দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশামস, মুজাহিদ বাহিনী কর্তৃক বাংলাদেশে সংঘটিত নৃশংস গণহত্যা ও মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতকারীদের শাস্তির জন্য মহান জাতীয় সংসদ আইন প্রণয়ন করবে। ইতিমধ্যে এ আইনটির খসড়া তৈরি করা হয়েছে বলে আইনমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছেন।

received_1318565274902489আমরা শহীদের রক্তঋণ শোধ করব। মুক্তিযুদ্ধের গৌরবের ইতিহাসকে মহিমান্বিত করব।

আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি।

এডভোকেট ফজিলাতুন নেসা বাপ্পি এমপি : আইনজীবী ও সংসদ সদস্য



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি
Designed By Linckon